প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সারাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিপণন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। আবাসিক গ্যাস সংকটের মধ্যে যেখানে এলপিজি সিলিন্ডার ছিল মানুষের শেষ ভরসা, সেখানে সেই বিকল্প ব্যবস্থাটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রান্নাঘর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্যাস না পেয়ে ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ ও হতাশা।
সরেজমিনে রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ। যেসব দোকান খোলা আছে, সেখানে সারি সারি খালি সিলিন্ডার পড়ে থাকলেও গ্যাস নেই। অনেক দোকানদার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন, নতুন করে গ্যাস সরবরাহ না আসা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব নয়। এতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকান ঘুরেও গ্যাস কিনতে না পেরে বাড়ি ফিরছেন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আব্দুল হালিম বলেন, সকাল থেকেই তিনি বাসার জন্য একটি গ্যাস সিলিন্ডার খুঁজছেন। এলাকার একের পর এক দোকানে গিয়েও কোথাও গ্যাস পাননি। বাড়িতে ছোট সন্তান ও বয়স্ক মা থাকায় রান্না বন্ধ থাকলে কীভাবে চলবেন, তা ভেবে তিনি দিশেহারা। শুধু হালিম নন, রাজধানীর হাজারো পরিবার একই সংকটের মুখে পড়েছে।
ভোক্তাদের অভিযোগ, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও তারা পাইপলাইনের গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন চুলা জ্বলে না বা খুব কম চাপ থাকে। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তারা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এলপিজির দাম বেড়ে গেলেও কোনোমতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। এখন সেটিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক বাসায় রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনছেন, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও। রাজধানীর বিভিন্ন ছোট খাবারের দোকান ও হোটেল মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস না পাওয়ায় তারা রান্না করতে পারছেন না। ফলে সকাল ও দুপুরে খাবার খেতে এসে অনেক ক্রেতাই ফিরে যাচ্ছেন। এতে তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। কিছু রেস্তোরাঁ বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎচালিত চুলা বা অন্য জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পক্ষ থেকে। সংগঠনটি বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। ফলে দেশজুড়ে একযোগে এলপিজি বাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন করে মূল্য সমন্বয় না করলে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধ না করা হলে তারা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি শুরু করবেন না। তার দাবি, বর্তমান দামে গ্যাস বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবহন খরচ, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের নিয়মিত অভিযান দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জরিমানা ও হয়রানির কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হচ্ছে এবং সংকট পরিস্থিতি তীব্রতর হচ্ছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট কমানো এবং দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কর ও ভ্যাট ছাড় পেলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এলপিজি খাত দীর্ঘদিন ধরেই নীতিগত অনিশ্চয়তা ও সমন্বয়ের অভাবে ভুগছে। একদিকে আবাসিক গ্যাস সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই অবস্থায় বাজারে হঠাৎ করে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। তাই দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণায় দেশের লাখো মানুষ চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। রান্নাঘর থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ পর্যন্ত গ্যাস সংকটের ছায়া পড়েছে সর্বত্র। এখন সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা—সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্রুত সমঝোতা হবে এবং এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, যাতে নিত্যদিনের জীবনযাত্রা আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।