প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বান্দার জীবনের সর্বোচ্চ কামনা ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। দুনিয়ার সফলতা কিংবা ব্যর্থতা, সুখ কিংবা দুঃখ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সে আল্লাহকে কতটা সন্তুষ্ট করতে পারল তার ওপর। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো তাঁর ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের প্রতি অন্তর থেকে সন্তুষ্ট থাকা। এই সন্তুষ্টি শুধু মুখে স্বীকার করার বিষয় নয়; বরং এটি হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস, ধৈর্য, আস্থা ও আত্মসমর্পণের সমন্বিত প্রকাশ।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের ব্যাখ্যায় আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ অত্যন্ত গভীর। আল্লামা ইবনে আতা (রহ.) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি হলো বান্দার হৃদয়ের সেই প্রশান্ত অবস্থা, যেখানে সে অনাদিকাল থেকে আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার প্রতি সম্পূর্ণ তৃপ্ত থাকে। কারণ সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আল্লাহ কখনোই তাঁর বান্দার জন্য অকল্যাণ নির্ধারণ করেন না; বরং যা কিছু ঘটে, তাতে না জানা কোনো কল্যাণ লুকিয়ে থাকে। এই বিশ্বাসই বান্দাকে অভিযোগ, হতাশা ও অসন্তোষ থেকে মুক্ত রাখে।
আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এর মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আদম সন্তানের জন্য আল্লাহ যা ফয়সালা করেন তাতে সন্তুষ্ট থাকাই তার সৌভাগ্য। আর আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা ছেড়ে দেওয়া এবং তাঁর ফয়সালার ওপর অসন্তুষ্ট হওয়াই হলো দুর্ভাগ্য। এই হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, ভাগ্য ও পরিস্থিতির প্রতি অসন্তোষ আসলে বান্দার নিজের ক্ষতির কারণ হয়, আল্লাহর সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।
ইসলামী শিক্ষায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির প্রকাশ বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। প্রথমত, আল্লাহকে ইলাহ ও রব হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা। বিশুদ্ধ ঈমানের মাধ্যমে এই সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। এর অর্থ হলো, জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমার সঙ্গে অন্যায় করেননি; বরং তিনিই আমার জন্য উত্তমটাই নির্ধারণ করেছেন। তৃতীয়ত, জীবনের বাস্তবতায় ঘটে যাওয়া সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, সাফল্য ও ব্যর্থতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পরীক্ষা হিসেবে মেনে নেওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না তোলা। ধৈর্য ও আস্থার মাধ্যমে এই সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশকে ইসলামী শরিয়াহ দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেছে। একদিকে রয়েছে দ্বিনি বা শরয়ি নির্দেশ, যেমন ফরজ, হারাম, হালাল ও শরিয়াহসংক্রান্ত বিধান। এগুলো মেনে নেওয়া ও পালন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অবশ্যকর্তব্য। কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করার অধিকার নেই। অন্যদিকে রয়েছে জাগতিক নির্ধারণ, যেমন রোগ-ব্যাধি, বিপদ-আপদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক ক্ষতি। এসব বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকার বিধান পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোথাও ধৈর্য ধারণ করা সুন্নত বা মুস্তাহাব, আবার কোথাও আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে নির্লিপ্ত থাকা হারামও হতে পারে।
আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার জন্য আলেম ও বুযুর্গরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহর হুকুম মানতে সর্বদা প্রস্তুত থাকা। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়াজ (রহ.) বলেছেন, বান্দা তখনই সন্তুষ্টির স্তরে পৌঁছে, যখন সে আল্লাহ যা দেন তা গ্রহণ করে, যা দেন না তাতেও তুষ্ট থাকে, সব অবস্থায় ইবাদত অব্যাহত রাখে এবং আল্লাহ ডাকলে সাড়া দেয়। এর সঙ্গে নিজের সব কিছু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহর সিদ্ধান্ত যে অনিবার্য, এই বিশ্বাস বান্দাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে বা মানুষের জীবনে যে বিপর্যয় আসে, তা সংঘটিত হওয়ার আগেই লিপিবদ্ধ থাকে। এই উপলব্ধি মানুষকে অতিরিক্ত শোক, ভয় ও অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে। পাশাপাশি এই বিশ্বাসও জরুরি যে আল্লাহই বান্দার জন্য সবচেয়ে কল্যাণকামী। অনেক সময় মানুষ যে বিষয়কে অপছন্দ করে, তার মধ্যেই আল্লাহ বড় কল্যাণ লুকিয়ে রাখেন।
বিপদ-আপদের সময় আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করাও সন্তুষ্টির পথকে সহজ করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিপদ যত বড় হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে। আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করেন। যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এই উপলব্ধি দুঃখ-কষ্টকে অর্থবহ করে তোলে।
দোয়ার মাধ্যমেও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় বলে যে সে আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বিন এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসুল হিসেবে মেনে সন্তুষ্ট, আল্লাহ তার সন্তুষ্টির দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন। এটি শুধু উচ্চারণ নয়, বরং হৃদয়ের দৃঢ় ঘোষণা।
সবর বা ধৈর্য সন্তুষ্টিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হজরত উমর (রা.) বলেছেন, সব কল্যাণ সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত। যদি সন্তুষ্ট থাকা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বভাবজাত কষ্ট, দুঃখ বা অশ্রু আল্লাহর প্রতি অসন্তোষের প্রমাণ নয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজ সন্তানের মৃত্যুতেও কেঁদেছেন, কিন্তু তাঁর মুখে কখনোই আল্লাহর অসন্তোষসূচক কোনো কথা আসেনি। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, হৃদয় ব্যথিত হতে পারে, চোখে অশ্রু আসতে পারে, তবে মুখে বলতে হবে তা-ই যা আল্লাহ পছন্দ করেন।
আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি মূলত ঈমানের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক। এটি এমন এক মানসিক ও আত্মিক অবস্থা, যেখানে বান্দা সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে সর্বোত্তম বলে মেনে নেয়। এই সন্তুষ্টিই মানুষকে দুনিয়ার অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে আখিরাতের সফলতার পথে এগিয়ে নেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।