দুনিয়ার মোহে আখেরাত হারানোর কঠিন সতর্কবার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
দুনিয়ার মোহে আখেরাত হারানোর কঠিন সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র কোরআন মানবজীবনের জন্য শুধু আখেরাতের মুক্তির পথই নির্দেশ করে না, বরং দুনিয়ার জীবনকে কীভাবে অর্থবহ, ভারসাম্যপূর্ণ ও নৈতিকভাবে সুন্দর করা যায়—তারও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। মানুষের চিরন্তন একটি দুর্বলতা হলো দুনিয়ার তাত্ক্ষণিক লাভের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হওয়া। সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ-বিলাস ও সামাজিক মর্যাদার মোহ অনেক সময় মানুষকে আখেরাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির কথা ভুলিয়ে দেয়। সুরা বনি ইসরাঈলের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এই মানবিক প্রবণতাকে সামনে রেখে একটি গভীর সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

مَنۡ كَانَ یُرِیۡدُ الۡعَاجِلَۃَ عَجَّلۡنَا لَهٗ فِیۡهَا مَا نَشَآءُ لِمَنۡ نُّرِیۡدُ ثُمَّ جَعَلۡنَا لَهٗ جَهَنَّمَ ۚ یَصۡلٰىهَا مَذۡمُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا

সরল অনুবাদে এই আয়াতের মর্মার্থ হলো—যে ব্যক্তি পার্থিব সুখ-সম্ভোগই কামনা করে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর হেকমত অনুযায়ী যাকে যতটুকু ইচ্ছা ততটুকুই দুনিয়াতে দিয়ে দেন; কিন্তু পরিণামে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হয়, যেখানে সে নিন্দিত ও অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত অবস্থায় প্রবেশ করবে।

এই আয়াতটি কেবল শাস্তির ঘোষণা নয়; বরং এটি এক গভীর জীবনদর্শন। এখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষের নিয়ত, লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন। মানুষ যদি তার সমস্ত চেষ্টা, মেধা ও শ্রম শুধু দুনিয়ার তাৎক্ষণিক লাভের পেছনে ব্যয় করে, তবে সে যা পাওয়ার, তা এই দুনিয়াতেই পাবে। কিন্তু এই পাওয়াটিও নিঃশর্ত নয়। তাফসিরে ইবন কাসীর ও ফাতহুল কাদীরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

প্রথম শর্ত হলো—আল্লাহ তায়ালা কাউকে তার চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সবকিছু দিতে বাধ্য নন। তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন, ততটুকুই দেন। অনেক মানুষ প্রচণ্ড চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায় না, আবার কেউ কেউ তুলনামূলক কম প্রচেষ্টায় বড় সাফল্যের মুখ দেখে। এটি আল্লাহর হেকমত ও প্রজ্ঞার অংশ। দুনিয়ার সাফল্য কখনোই মানুষের শ্রমের সরল সমানুপাতিক ফল নয়।

দ্বিতীয় শর্ত হলো—এই দুনিয়াবি প্রাপ্তি সবার জন্য নয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে সমীচীন মনে করেন, তাকেই দেন। অনেকে দুনিয়ার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেও কাঙ্ক্ষিত স্বাচ্ছন্দ্য, সম্মান বা সুখ পায় না। এই বাস্তবতা মানুষের সামনে বারবার প্রমাণ করে যে দুনিয়ার অর্জন চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না।

এই আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয়, দুনিয়ার জীবনে সাফল্য বা প্রাচুর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির নিশ্চিত প্রমাণ নয়। বরং কখনো কখনো এটি এক ধরনের পরীক্ষা, আবার কখনো সতর্কবার্তা। যে ব্যক্তি আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না বা আখেরাত পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করতে প্রস্তুত নয়, সে তার সমস্ত মনোযোগ দুনিয়ার সাফল্যের দিকেই কেন্দ্রীভূত করে। ফলে সে আখেরাতের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেয় না। কোরআনের ভাষায়, এমন ব্যক্তি আখেরাতে শূন্য হাতে উপস্থিত হবে।

ইবন কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি আখেরাতকে তুচ্ছ করে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, তার কর্মফলও সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। সে দুনিয়ায় যা পেয়েছে, সেটাই তার শেষ প্রাপ্তি। আখেরাতে তার জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বরং সেখানে তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।

এই আয়াতের শিক্ষা আজকের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞা প্রায় পুরোপুরি দুনিয়ামুখী। ভালো চাকরি, বেশি আয়, বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সামাজিক পরিচিতিকেই জীবনের চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আখেরাতের জবাবদিহির বিষয়টি অনেক সময় আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। ফলে মানুষ অজান্তেই এমন এক পথে হাঁটে, যা তাকে সাময়িক লাভ দিলেও চূড়ান্ত ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।

কোরআনের এই আয়াত মানুষকে ভারসাম্যের দিকে আহ্বান জানায়। ইসলাম দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না। বরং দুনিয়াকে আখেরাতের ফসল ক্ষেত হিসেবে বিবেচনা করতে শেখায়। দুনিয়ায় কাজ করতে হবে, উপার্জন করতে হবে, পরিবার-সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে—তবে সবকিছুর মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের সফলতা। যখন দুনিয়াবি কাজও আখেরাতের নিয়তে করা হয়, তখন তা ইবাদতে পরিণত হয়।

এই আয়াত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—আল্লাহর অনুগ্রহ শুধু দুনিয়ার প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত অনুগ্রহ হলো আখেরাতের মুক্তি। দুনিয়ার প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর দারিদ্র্য বা কষ্ট অনেক সময় মানুষকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে আসে। তাই একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আল্লাহ কী দিচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহ এতে সন্তুষ্ট কি না।

সবশেষে বলা যায়, সুরা বনি ইসরাঈলের ১৮ নম্বর আয়াত মানুষের জীবনের দিকনির্দেশক এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার নগদ লাভ যদি আখেরাতের চরম ক্ষতির কারণ হয়, তবে সেই লাভ আদতে কোনো লাভ নয়। প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আখেরাতকে বিসর্জন দেয় না। দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হলো কোরআনের শিক্ষা এবং মুমিন জীবনের প্রকৃত সাফল্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত