মিয়ানমারে বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিমান হামলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১৯ বার
মিয়ানমারে বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিমান হামলা

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা আরও ভয়াবহ রূপ নিল, যখন বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো মানবিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় একদিনেই প্রাণ হারালেন অন্তত ২৭ জন বেসামরিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন বহু মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দেশটির কাচিন ও মাগওয়ে অঞ্চলে পৃথক এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মিয়ানমারের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতির বরাতে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাচিন রাজ্যের ভামো টাউনশিপের কাউং জার গ্রামে একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালে জান্তা বাহিনী বিমান হামলা চালায়। স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে আকাশ থেকে বোমা বর্ষণের ফলে মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে গ্রামটি। বিদ্রোহী সংগঠন কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি বা কেআইএর তথ্যমতে, এই হামলায় অন্তত ২২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং শিশুসহ আরও ২৮ জন আহত হন।

কাউং জার গ্রামটি মূলত সংঘাতপীড়িত এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত পরিবারদের অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। ইরাবতী নদীর অপর পাশে ভামো শহরের কাছাকাছি অবস্থান করা এই গ্রামে কোনো সামরিক স্থাপনা বা বিদ্রোহী ঘাঁটি ছিল না বলে দাবি করেছে কেআইএ। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে আশপাশের এলাকা থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুরা জড়ো হয়েছিলেন। সেই শোকের সমাবেশই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, বাড়ির ভেতর ও আঙিনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মরদেহ। অনেকের শরীর এতটাই ক্ষতবিক্ষত যে চেনার উপায় নেই। কান্না আর আর্তনাদের শব্দে ভরে ওঠা সেই দৃশ্য মিয়ানমারের চলমান মানবিক সংকটকে আরও নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।

কেআইএর মুখপাত্র কর্নেল নও বু এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, কাউং জার গ্রামে কেআইএর কোনো সদস্য বা অবস্থান ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, জান্তা বাহিনী জেনেশুনেই বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে। তার ভাষায়, তারা শত্রু আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। স্কুল, বাজার কিংবা যে কোনো জনসমাগমেই তারা নির্বিচারে বোমা ফেলছে। এই বক্তব্য মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

একই দিনে আরেকটি ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে মাগওয়ে অঞ্চলের আউংলান টাউনশিপের তাট কোনে গ্রামে। স্থানীয় তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন আউংলান ইনফরমেশন গ্রুপ জানায়, সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় মানুষজন জড়ো হলে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা চালানো হয়। এই হামলায় এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন। বিয়ের আনন্দের প্রস্তুতি মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় শোকের মাতমে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিয়ের জন্য বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছিলেন। হঠাৎ যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হলে চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও প্রাণ বাঁচাতে পারেননি। আহতদের অনেককে আশপাশের গ্রাম ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধের সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।

এই দুই হামলার পাশাপাশি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাখাইন রাজ্যেও জান্তা বাহিনীর বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। কিয়াউকতাও ও পন্নাগিউন টাউনশিপ সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি পরিচালিত একটি কারাগারে বিমান হামলা চালানো হয়। এতে আটক থাকা ২১ জন জান্তা সেনা ও তাদের স্বজন নিহত হন এবং আরও প্রায় ৩০ জন আহত হন। যদিও এই হামলায় নিহতরা সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন, তবুও এটি মিয়ানমারের সংঘাত পরিস্থিতি যে ক্রমেই আরও জটিল ও সহিংস হয়ে উঠছে, তারই ইঙ্গিত দেয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে মিয়ানমারের জান্তা সরকার বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিমান হামলা বেড়েছে এবং এর বড় অংশের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিয়ে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, স্কুল বা আশ্রয়কেন্দ্র—কোনো কিছুই হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে জান্তা বাহিনী এখন ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে নির্বিচার বিমান হামলা চালাচ্ছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের জীবন এখন প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। কখন কোথায় বোমা পড়বে, কেউ জানে না। একটি বিয়ের আয়োজন কিংবা প্রিয়জনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়াও এখন প্রাণনাশের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা শুধু শান্তিতে বেঁচে থাকতে চান, কিন্তু আকাশ থেকে নেমে আসা মৃত্যু সেই সামান্য আকাঙ্ক্ষাকেও বারবার ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কেবল নিন্দা বা বিবৃতি নয়, মিয়ানমারে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। নইলে বিয়ে আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো মানবিক মুহূর্তগুলো আরও দীর্ঘদিন রক্তে রঞ্জিত হতে থাকবে।

অন্যান্য সংবাদ পড়ুন

  1. তারেক রহমানের আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক
  2. উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী গড়ার প্রত্যয়: ডা. শফিকুর রহমান

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com