আফগানিস্তান যুদ্ধে ট্রাম্পের মন্তব্যে ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়া

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০৪ বার
আফগানিস্তান যুদ্ধে ট্রাম্পের মন্তব্যে

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যকে “অপমানজনক” এবং “ভয়াবহ” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের মন্তব্য আফগান যুদ্ধে নিহত বা আহত সেনা ও তাদের পরিবারকে আঘাত করতে পারে। স্টারমার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের উচিত তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারে হামলার পর আল-কায়েদা ও তালেবান দমনকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। দুই দশকের এই যুদ্ধে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোতে মোট ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন ছিল। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরের আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর মোট ৩ হাজার ৪৮৬ সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৪৬১, যুক্তরাজ্যের ৪৫৭, কানাডার ১৬৫। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও অন্যান্য দেশও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

২০২১ সালে ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করলে তালেবান ফের কাবুলের ক্ষমতা দখল করে এবং দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ট্রাম্প সম্প্রতি আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোর অনেক দেশ সেনাসদস্য পাঠিয়েছে, কিন্তু তারা মূল ফ্রন্টলাইনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপসহ মিত্রদের জন্য অনেক কিছু করেছে, কিন্তু বিনিময়ে বিশেষ কিছুই পায়নি।

যুক্তরাজ্যে ট্রাম্পের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সাংবাদিকদের বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যকে অপমানজনক এবং স্পষ্টতই ভয়াবহ মনে করি। এটি যুদ্ধে নিহত বা আহত সেনাদের পরিবারের প্রতি অসম্মান।” তিনি আরও বলেন, “যদি আমি এমন মন্তব্য করে থাকতাম, তবে অবশ্যই ক্ষমা চাইতাম। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্টকেও তার মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।”

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিভিন্ন সদস্যও ট্রাম্পের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। লেবার এমপি এমিলি থানবেরি বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য অত্যন্ত অপমানজনক। লন্ডন সবসময় ওয়াশিংটনের পাশে ছিল এবং আফগান যুদ্ধে আমাদের সেনাদের আত্মত্যাগ অতুলনীয়।” লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ট্রাম্প কিভাবে ন্যাটো সদস্যদের আত্মত্যাগকে হালকাভাবে দেখছেন তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। কনজারভেটিভ এমপি বেন ওবিস-জেক্টি বলেন, “যুক্তরাজ্য এবং ন্যাটো অংশীদারদের আত্মত্যাগকে এভাবে হালকাভাবে দেখা দুঃখজনক।”

এদিকে, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট ট্রাম্পের দাবির জবাবে বলেন, আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সেনা রক্ত দিয়েছেন। তার ভাষ্যে, প্রতি দুই মার্কিন সেনার বিপরীতে একজন ন্যাটো সেনা নিহত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “আমরা সবাই জানি আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এটি কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা যায় না।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য শুধু যুক্তরাজ্য বা ন্যাটো দেশগুলোকে ব্যথিত করেনি, বরং আফগানিস্তান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ও কূটনৈতিক প্রভাবের ওপরও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ২০ বছরের যুদ্ধ এবং বিপুল রক্তক্ষয় সম্পর্কে এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং ন্যাটোর মধ্যে অংশীদারিত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কিছুটা উত্তেজনা বিরাম পেয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান যুদ্ধের বিষয়টি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ন্যাটো দেশগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যকে “অপমানজনক” মনে করছে এবং এটি তাদের সেনাদের আত্মত্যাগকে হ্রাস করার সমতুল্য বলেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

এই ঘটনা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নেতাদের মন্তব্যের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে। যুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা ও মানবিক ক্ষতি বিবেচনা না করে এমন বক্তব্য অনেক দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ক্ষোভের জন্ম দিতে সক্ষম। আফগান যুদ্ধে নিহত ও আহতদের পরিবার, এছাড়া ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সেনারা এই মন্তব্যের প্রভাবের মুখোমুখি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে আফগানিস্তান, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, সেনাদের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। এছাড়া, যুদ্ধের মূল্যায়ন, আত্মত্যাগের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নীতিমালা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন আলোচনার জন্ম হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com