প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জ, সিলেট বিভাগের এই অঞ্চলকে বহুদিন ধরেই বলা হয় ‘জলের দেশ’। আর এই জলের দেশে এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময় হয়ে আছে আমলশী ইউনিয়নের ত্রিমোহনা। যারা একবার এই জায়গায় গেছেন, তারা জানেন—ত্রিমোহনার স্রোতে প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের রংতুলিতে ছবি এঁকেছে।
ত্রিমোহনা নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এর পরিচয়—তিন নদীর মিলনস্থল। সুরমা, কুশিয়ারা আর জকিগঞ্জ খাল এসে মিশেছে এক কোলাহলে। নদীর বুক চিরে দূর থেকে ভেসে আসে উজান বানের শব্দ, কোথাও ছোট ছোট ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ, আবার কোথাও স্থির জলরাশির ওপর ভাসছে শাপলা-শালুক আর মাছরাঙার ছুটে যাওয়া। এ যেন নদী আর বিলের, ঢেউ আর কূলে ছায়া ফেলা গাছেদের এক অনবদ্য আলাপচারিতা।
ত্রিমোহনায় দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে দেখা যায়, ওপারের ভারতীয় গ্রামগুলোর ছায়াও মিশে আছে এই জলাভূমির ছবিতে। বর্ষায় এর রূপ সবচেয়ে মনকাড়া—তখন তিন নদীর মিলনে জলের বিস্তার কোনো পাড় বা সীমান্ত মানে না। দিগন্তজোড়া জল আর অগণিত দেশি পাখির কলকাকলিতে মুহূর্তেই ভেসে যায় শহুরে জীবনের সমস্ত ক্লান্তি।
স্থানীয় মানুষের কাছে ত্রিমোহনা শুধু ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং জীবিকার অংশও। জেলের জাল, নৌকার কুলকুল ধ্বনি আর বিকেলের হাটের গুঞ্জন—সব মিলে এখানকার মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন যেন এক জীবন্ত গল্প হয়ে আছে যুগের পর যুগ। অনেকে বলেন, সূর্যাস্তের সময়টুকুই সবচেয়ে অপার্থিব। লালচে আলো নদীর বুকে পড়ে যখন ঢেউগুলোকে রাঙিয়ে তোলে, তখন যেন ত্রিমোহনার জল ও আকাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
স্থানীয় পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানে ছোট ছোট নৌকা ভাড়া নিয়ে কেউ গানের তালে নদী দেখতে বেরিয়ে পড়ে, কেউ আবার কাদামাটি আর গাছপালার ভেতর হেঁটে খুঁজে ফেরে শিকড়ের ঘ্রাণ। কেউ স্রেফ চুপ করে বসে থাকে কূলে—কোনো শব্দ নেই, শুধু জলের শব্দ আর বাতাসের শিস।
তবে ত্রিমোহনার এমন অনন্য প্রকৃতি রক্ষার দাবি করছেন সচেতন এলাকাবাসী ও স্থানীয় সাংবাদিকরা। ভরাট, দখল আর অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে এই নদীমাতৃক স্বর্গভূমি হয়তো হারিয়ে যেতে পারে একদিন। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না—এ নিয়ে ক্ষোভও কম নয়।
ত্রিমোহনা ঘিরে স্থানীয়দের স্বপ্ন—এই জায়গা হবে দেশের অন্যতম জলভ্রমণ গন্তব্য। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো তৈরি, স্থানীয় নৌকাচালক ও মৎসজীবীদের প্রশিক্ষণ, নদী পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা—সবই প্রয়োজন এই সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে।
জকিগঞ্জের আমলশীর ত্রিমোহনা তাই শুধু তিন নদীর মিলন নয়, মানুষের স্বপ্ন আর প্রকৃতির অপরূপতারও মিলনস্থল—যা একবার দেখলে ফিরে আসতে মন চায় না, আবারও যেতে মন চায় বারবার।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন