প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পালিত হচ্ছে পবিত্র শবেবরাত। হিজরি শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী এই রাত মুসলমানদের কাছে ‘শবেবরাত’ বা ‘লাইলাতুল বরাত’ নামে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাসে এটি মুক্তি, ক্ষমা ও সৌভাগ্যের রজনি হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় বিবেচিত। এই রাতকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে থাকে গভীর আবেগ, আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের তীব্র বাসনা।
‘শবেবরাত’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য রহমত ও মাগফেরাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। অতীতের গুনাহ মাফ করে ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণ ও হেদায়াত দান করেন—এমন বিশ্বাস থেকেই মুসলমানরা এই রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকেন। নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার ও বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন।
শবেবরাতের রাত মুসলিম সমাজে কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবিকতা ও সামাজিক সৌহার্দ্যের চর্চা। অনেক পরিবার এ উপলক্ষে হালুয়া-রুটি ও নানা উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করে। এই দান ও ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সহমর্মিতার চর্চা বাড়ে। সন্ধ্যার পর অনেকে কবরস্থানে গিয়ে প্রয়াত স্বজনদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করেন, যা শবেবরাতের আরেকটি পরিচিত অনুষঙ্গ।
পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আজ সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত, ওয়াজ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন থাকবে। মাগরিবের নামাজের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচি শুরু হবে। রাত সাড়ে আটটায় শবেবরাতের শিক্ষা, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। পুরো আয়োজনের সভাপতিত্ব করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আ. ছালাম খান। ফজরের নামাজের পর আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা শেষ হবে।
শবেবরাত উপলক্ষে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও বাণী দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এক শুভেচ্ছা বার্তায় দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র শবেবরাতের মোবারকবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শবেবরাত মহান আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের এক অনন্য সুযোগ। এই পবিত্র রজনীতে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের শুদ্ধ করা এবং সব ধরনের অন্যায়, অবিচার ও অনাচার পরিহার করে ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও শবেবরাত উপলক্ষে পৃথক এক বার্তায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শবেবরাত নাজাত ও মাগফিরাতের রাত, যা মানুষকে সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের পথে আহ্বান জানায়। সহিংসতা, বিদ্বেষ ও বিভেদ পরিহার করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন তিনি।
শবেবরাতকে ঘিরে গণমাধ্যমেও বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও স্টেশন এই উপলক্ষে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। আলেমদের আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত ও ইসলামি সংগীতের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতারা ঘরে বসেই এই পবিত্র রাতের তাৎপর্য অনুধাবন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শবেবরাতের মূল শিক্ষা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। এই রাতে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং নিজের আচরণ, নৈতিকতা ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানানো হয়। অন্যের প্রতি অবিচার না করা, হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করা এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার অঙ্গীকারই এই রাতের প্রকৃত তাৎপর্য।
শবেবরাত মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তাও বহন করে। শাবান মাসের পরই আসে মাহে রমজান, যা সিয়াম, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে পরিচিত। অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান মনে করেন, শবেবরাত থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। এই রাত মানুষকে রমজানের জন্য মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দেশের বিভিন্ন মসজিদে আজ রাত জুড়ে বিশেষ দোয়া ও ইবাদতের আয়োজন করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যাতে ধর্মপ্রাণ মানুষ নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে পারেন। আলেম-ওলামারা সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে পবিত্র শবেবরাত মুসলমানদের জীবনে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রাত। এটি মানুষকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে সঠিক পথে চলার প্রেরণা দেয়। ক্ষমা, দয়া ও কল্যাণের এই রজনীতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রার্থনা করেন—মহান আল্লাহ যেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণ দান করেন।