কৃপণতা ও অপচয়ের ক্ষতি: কোরআনের ভারসাম্যের শিক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ বার
কৃপণতা ও অপচয়ের ক্ষতি: কোরআনের ভারসাম্যের শিক্ষা

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ কীভাবে উপার্জন করে, কীভাবে ব্যয় করে এবং কোন পথে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে—এর ওপর নির্ভর করে ব্যক্তি, পরিবার এমনকি পুরো সমাজের ভারসাম্য ও শান্তি। কোরআনুল কারিম মানুষের এই আর্থিক আচরণকে অবহেলা করেনি; বরং বারবার সতর্ক করেছে কৃপণতা ও অপচয়—এই দুই চরমতার ক্ষতিকর পরিণতি সম্পর্কে। সুরা বনি ইসরাঈলের ২৯ নম্বর আয়াত এ বিষয়ে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে, যেখানে সংযম, ভারসাম্য ও দায়িত্বশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তুমি তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণরূপে মেলেও দিও না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও আফসোসকৃত হয়ে বসে পড়বে।” এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ আয়াতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘হাত গলায় বেঁধে রাখা’ দ্বারা কৃপণতাকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘হাত পুরোপুরি মেলে দেওয়া’ দ্বারা বোঝানো হয়েছে লাগামহীন অপচয় বা অযথা ব্যয়।

ইবন কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলেও এর শিক্ষা সমগ্র উম্মতের জন্য প্রযোজ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে কৃপণতা এমন একটি দোষ, যা মানুষকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, সহমর্মিতা নষ্ট করে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ায়। অন্যদিকে, অপচয় মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে অনুতাপ ও লাঞ্ছনার মুখে ঠেলে দেয়।

এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো মিতাচার—অর্থাৎ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম চায় না মানুষ এমন কৃপণ হোক যে সে নিজের প্রয়োজন মেটাতে বা অন্যের সহায়তায় হাত বাড়াতে ভয় পায়। আবার ইসলাম এটাও সমর্থন করে না যে মানুষ নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করে নিঃস্ব হয়ে পড়ুক। কারণ যখন কেউ সামর্থ্যের অতিরিক্ত ব্যয় করে, তখন একসময় তার কাছে ব্যয় করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তখন সে শুধু আর্থিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে।

আয়াতে ব্যবহৃত ‘হাসীর’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইবন কাসির (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, হাসীর বলা হয় সেই বাহনকে, যা দুর্বলতা ও ক্লান্তির কারণে আর চলতে পারে না। অর্থাৎ, অপচয়ের পরিণতিতে মানুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে তার সামনে এগোনোর শক্তি থাকে না। ফাতহুল কাদীর গ্রন্থে ‘হাসীর’ শব্দের আরেক অর্থ হিসেবে ‘তিরস্কৃত হওয়া’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তব জীবনেও দেখা যায়, যে ব্যক্তি আজ অপচয়ের কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, কাল তাকেই সমাজের কাছে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদিসে কৃপণতা ও উদারতার চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃপণ ও খরচকারীর উদাহরণ দুই ব্যক্তির মতো, যাদের শরীরে লোহার দুটি বর্ম পরানো আছে। খরচকারী যখন আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তখন তার বর্ম প্রশস্ত হতে থাকে, এমনকি তার পায়ের আঙুল পর্যন্ত ঢেকে দেয় এবং তার পদচিহ্নও মুছে যায়। অর্থাৎ, তার দান-খরচ তাকে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি দেয়। অপরদিকে কৃপণ ব্যক্তি যখন খরচ করতে চায়, তখন তার বর্ম সংকুচিত হয়ে যায়; যতই সে প্রশস্ত করতে চায়, ততই তা আরও আঁটসাঁট হয়ে পড়ে। এই উপমার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝিয়ে দিয়েছেন, কৃপণতা মানুষের আত্মাকে বন্দি করে ফেলে, আর দান ও সংযম আত্মাকে মুক্ত করে।

আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দুইজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন দোয়া করেন, “হে আল্লাহ! আপনি খরচকারীকে আরও সম্পদ দান করুন।” অন্যজন দোয়া করেন, “হে আল্লাহ! আপনি কৃপণকে নিঃস্ব করে দিন।” এই হাদিস মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাআলা উদারতা ও সঠিক পথে ব্যয়কে ভালোবাসেন, আর কৃপণতাকে অপছন্দ করেন।

ইসলাম কেবল দান করার কথা বলেই দায়িত্ব শেষ করেনি; বরং ব্যয়ের ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির শিক্ষা দিয়েছে। কোরআনের অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। অর্থাৎ, দান ও খরচ হতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, সঠিক জায়গায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। অযথা বিলাসিতা, লোক দেখানো ব্যয় কিংবা হারাম কাজে সম্পদ নষ্ট করা—সবই ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয়।

আধুনিক সমাজে এই আয়াতের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। ভোগবাদী সংস্কৃতিতে মানুষ একদিকে অযথা ব্যয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি হারাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভবিষ্যতের ভয়ে এমন কৃপণ হয়ে ওঠে যে, নিজের পরিবার ও সমাজের ন্যায্য অধিকারও আদায় করে না। সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াত আমাদের সেই দুই চরমতা থেকে বাঁচার পথ দেখায়।

মোটকথা, কৃপণতা ও অপচয়—দুটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। ইসলাম চায় মানুষ হোক ভারসাম্যপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও উদার। যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে, পরিবারকে সঠিকভাবে দেখবে এবং সমাজের অসহায়দের পাশে দাঁড়াবে—তবে অপচয় করবে না। এই মধ্যপন্থাই ইসলামের সৌন্দর্য, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত