প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের জীবনে রিজিক, সন্তান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা একটি চিরন্তন বাস্তবতা। এই দুশ্চিন্তাকে কেন্দ্র করেই যুগে যুগে মানুষ নানা ভুল সিদ্ধান্তে জড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সেই ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতেই কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাঈলের ৩১ নম্বর আয়াতে সন্তান হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে ইসলামের রিজিক-দর্শনকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা কোরো না, আমিই তাদের জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।”
এই আয়াতটি শুধু একটি নিষেধাজ্ঞাই নয়, বরং মানুষের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তনের আহ্বান। এখানে আল্লাহ তাআলা প্রথমেই মানুষের ভয়ের মূল উৎসকে চিহ্নিত করেছেন—দারিদ্র্যের ভয়। তারপর সেই ভয়কে ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করেছেন, রিজিকের দায়িত্ব মানুষের নয়, আল্লাহর। সন্তান যেমন আল্লাহর সৃষ্টি, তেমনি তাদের রিজিকও তাঁরই দায়িত্ব।
ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াত যুগে আরব সমাজে একটি নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রথা প্রচলিত ছিল। অনেক পরিবার সন্তান জন্মের পরপরই, বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের হত্যা করত। তাদের ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে এসব সন্তান তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, দারিদ্র্য বাড়াবে এবং সামাজিকভাবে লজ্জার কারণ হবে। এই অমানবিক প্রথা সমাজে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে, মানুষ এটিকে অপরাধ হিসেবেই ভাবত না। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করে মানবতার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেন।
হাদিসে এই গুনাহের ভয়াবহতা আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি। নবীজি (সা.) উত্তরে বলেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তিনি বলেন, তোমার সঙ্গে খাবে—এই ভয়ে তোমার সন্তানকে হত্যা করা। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তান হত্যা কতটা ভয়ংকর অপরাধ যে, তা শিরকের পরপরই উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত দিক রয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরকেও।” অন্যদিকে সুরা আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আমিই তোমাদের রিজিক দিই এবং তাদেরকেও।” এই পার্থক্য ইঙ্গিত করে, কখনো সন্তান জন্মের আগেই দারিদ্র্যের ভয় কাজ করে, আবার কখনো নিজের রিজিকের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় জন্ম নেয়। উভয় অবস্থাতেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন যে, রিজিকের মালিক একমাত্র তিনিই।
ইসলামের জীবনদর্শনে রিজিক শুধু অর্থ বা খাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুস্থতা, জ্ঞান, নিরাপত্তা, সম্মান—সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। সন্তানও এক অর্থে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি রিজিক ও আমানত। এই আমানত রক্ষা করা, লালন-পালন করা এবং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় গড়ে তোলা পিতা-মাতার দায়িত্ব। দারিদ্র্যের অজুহাতে এই আমানত নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু অপরাধ নয়, বরং আল্লাহর ওপর অবিশ্বাসের শামিল।
আধুনিক যুগে সন্তান হত্যার রূপ পাল্টে গেছে, কিন্তু মূল মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে একই রয়ে গেছে। প্রকাশ্যে সন্তান হত্যা না হলেও, নানা সুন্দর শব্দের আড়ালে এই মহাপাপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’, ‘পরিকল্পিত পরিবার’, ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’—এ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে অনেক সময় নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করা হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান জন্মের আগেই যুক্তিসংগত ও বৈধ উপায়ে পরিকল্পনা করা আর দারিদ্র্যের ভয় বা স্বার্থপরতার কারণে গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি না বোঝার ফলেই আজ বিশ্বজুড়ে নৈতিক বিভ্রান্তি বাড়ছে।
এই আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, আল্লাহই রিজিকদাতা? নাকি বাস্তবে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো পরিচালিত হয় ভয়, হিসাব আর কৃত্রিম নিরাপত্তাবোধ দিয়ে? সন্তান বড় হবে, পড়াশোনা করবে, চাকরি পাবে কি না—এই সব চিন্তা মানুষের স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চিন্তা যদি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা আর স্বাভাবিক থাকে না।
ইসলাম মানুষকে দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে বলেনি। বরং দায়িত্ব ও তাওয়াক্কুলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে। সন্তান লালন-পালনে পরিকল্পনা থাকবে, পরিশ্রম থাকবে, কিন্তু সেই পরিকল্পনার ভিত্তি হবে আল্লাহর ওপর ভরসা। কারণ আল্লাহ তাআলাই ঘোষণা করেছেন, যিনি আজ আমাকে রিজিক দিচ্ছেন, তিনিই আগামীকাল আমার সন্তানকেও দেবেন।
সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াত কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের জন্য নয়। এটি সব যুগের মানুষের জন্য একটি চিরন্তন নীতিবাক্য। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ—কোনো কিছুই মানবজীবনের মূল্যকে খাটো করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন এবং সেই জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, এই আয়াত আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা ও আচরণকে নতুন করে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানায়। সন্তান আল্লাহর দান, রিজিক আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং জীবন রক্ষা ইসলামের মৌলিক আদর্শ। এই সত্য হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই মানুষ দারিদ্র্যের ভয়, ভবিষ্যতের শঙ্কা আর সামাজিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ও ঈমানদার জীবন গড়ে তুলতে পারবে।