প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র কোরআন মুসলমানের জীবনে শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি জীবনপথের দিশারি, হৃদয়ের প্রশান্তির উৎস এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য মাধ্যম। কোরআনের সঙ্গে সত্যিকারের ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই স্পষ্ট করতে হবে নিজের উদ্দেশ্য ও নিয়ত। কোরআন পড়ার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর কাছ থেকে হিদায়াত গ্রহণ করা, তাঁর নৈকট্য লাভ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কোরআনের মূল মর্ম ও উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়।
ইসলামি চিন্তাবিদেরা বলেন, কোরআন থেকে একজন মানুষ কী পাবে, তা নির্ভর করে সে কী নিয়ে কোরআনের কাছে যাচ্ছে তার ওপর। অর্থাৎ নিয়তই এখানে মুখ্য। কোরআন নিঃসন্দেহে হিদায়াতের জন্য নাজিল হয়েছে। কিন্তু যদি কেউ ভুল উদ্দেশ্য, সংকীর্ণ চিন্তা বা অপবিত্র নিয়ত নিয়ে কোরআন পড়ে, তবে সেই কোরআনই তার জন্য হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল্লাহ তাআলা নিজেই কোরআনে বলেছেন, এই কিতাবের মাধ্যমে তিনি অনেককে হিদায়াত দেন এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেন, তবে ফাসিকদের ছাড়া কাউকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন না। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কোরআনের আলো গ্রহণ করতে হলে হৃদয়কে আগে প্রস্তুত করতে হয়।
কোরআন যেহেতু আল্লাহর কালাম, তাই এটি পড়ার জন্য প্রয়োজন খাঁটি নিয়ত ও গভীর একনিষ্ঠতা। যেমনভাবে নামাজ, রোজা বা অন্য ইবাদতে ইখলাস অপরিহার্য, তেমনি কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেও তা জরুরি। অনেক সময় মানুষ কোরআনের সঙ্গে এমন কিছু নিয়ত জুড়ে দেয়, যা বাহ্যিকভাবে নিরীহ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে কোরআনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর মধ্যে একটি হলো কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দের জন্য কোরআন পড়া। কোরআন নিঃসন্দেহে গভীর জ্ঞান, অনন্য সাহিত্যশৈলী ও বিস্ময়কর ভাষাগত সৌন্দর্যের আধার। তা বুঝতে বুদ্ধি ও চিন্তার পূর্ণ ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু যদি কোরআনকে শুধুই গবেষণা, ইতিহাস বা ভাষা বিশ্লেষণের বিষয় বানানো হয় এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন বদলানোর কোনো চেষ্টা না থাকে, তবে সেই পড়া ফলপ্রসূ হয় না। কোরআন নিজেই এমন মানুষের কথা উল্লেখ করেছে, যারা জ্ঞান বহন করে কিন্তু সেই জ্ঞান তাদের উপকারে আসে না।
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো নিজের মত বা যুক্তি প্রমাণের জন্য কোরআনের কাছে যাওয়া। কেউ যদি আগে থেকেই একটি মতবাদ বা অবস্থান ঠিক করে নিয়ে কোরআন পড়ে, তাহলে সে আল্লাহর বাণী শোনার মানসিকতা নিয়ে কোরআনের কাছে যায় না। বরং নিজের চিন্তার প্রতিধ্বনি খুঁজে বেড়ায়। এতে করে কোরআনের প্রকৃত বার্তা আড়ালে চলে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধরনের মনোভাবের কঠোর নিন্দা করেছেন এবং নিজের ব্যক্তিগত মত দিয়ে কোরআনের ব্যাখ্যা করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এই সতর্কবার্তা আমাদের শেখায়, কোরআনের সামনে দাঁড়াতে হবে বিনয়ী হয়ে, শেখার মানসিকতা নিয়ে।
এর চেয়েও দুঃখজনক হলো পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যে কোরআন পড়া। কোরআনকে ব্যবহার করে খ্যাতি, মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান বা অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ভয়াবহ। দুনিয়ার কিছু সুবিধা হয়তো এতে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে হারিয়ে যায় আখিরাতের অমূল্য কল্যাণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াবি প্রশংসা বা খ্যাতির জন্য কোরআন শেখে ও শিক্ষা দেয়, তার পরিণতি হবে কঠিন। এই হাদিস আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়—আমি কি কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহকে খুঁজছি, নাকি নিজের নাম ও পরিচিতি?
অবশ্য কোরআনের মাধ্যমে শারীরিক আরোগ্য, মানসিক প্রশান্তি বা জীবনের কিছু সমস্যার সমাধান হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোরআন শিফা এবং রহমত—এ কথা কোরআনেই বলা হয়েছে। তবে এগুলো যেন কখনোই কোরআন পড়ার মূল উদ্দেশ্য হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ এসব সাময়িক লাভের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ এমন এক স্থায়ী হিদায়াত হারাতে পারে, যা পুরো জীবন ও আখিরাতকে আলোকিত করতে পারত।
কোরআনের প্রতিটি অক্ষর পড়ার মধ্যেই রয়েছে অগণিত সওয়াব। এই সওয়াবের কথা মনে রাখা নিয়তের অংশ হওয়া দোষের নয়; বরং এটি মানুষকে নিয়মিত তিলাওয়াতে উৎসাহিত করে। তবে এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, কোরআন বোঝা, গ্রহণ করা এবং তার ওপর আমল করার জন্য যে মহাপুরস্কারের ওয়াদা করা হয়েছে, তা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতের জন্যই অপরিসীম।
কোরআন ও সুন্নাহ হাতে পাওয়ার পর হিদায়াতের জন্য অন্য কোনো উৎসের পেছনে ছোটা মানে মরীচিকার পেছনে দৌড়ানো। এতে কোরআনের ওপর আস্থাহীনতা প্রকাশ পায় এবং দ্বৈত আনুগত্যের ঝুঁকি তৈরি হয়। আল্লাহর বাণীর সঙ্গে কাটানো সময়ের মতো মানুষকে আর কোনো কিছু এত কাছে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যায় না। কারণ কোরআনের মধ্যেই বান্দা সেই সৌভাগ্য লাভ করে, যেখানে তার রব নিজেই তাকে সম্বোধন করেন।
অতএব কোরআন পড়ার সময় একমাত্র প্রবল আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। হৃদয়, মন ও সময় উৎসর্গ করা তাঁর প্রেরিত হিদায়াতের জন্য। আল্লাহ কোরআনে এমন মানুষদের কথা বলেছেন, যারা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে বিকিয়ে দেয়। এই আত্মনিবেদনই একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত।
নিয়ত ও উদ্দেশ্য মানুষের দেহে আত্মার মতো, বীজের ভেতরের শক্তির মতো। বাইরে থেকে অনেক বীজ একই রকম দেখালেও ফল ধরার সময় তাদের প্রকৃত পার্থক্য প্রকাশ পায়। তেমনি নিয়ত যত পবিত্র ও উচ্চমানের হবে, আমলের মূল্য ও ফলও তত বেশি হবে। তাই নিজেকে বারবার প্রশ্ন করা জরুরি—আমি কেন কোরআন পড়ছি? এই আত্মজিজ্ঞাসা নিয়তকে খাঁটি ও একনিষ্ঠ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। কোরআনের সঙ্গে এই সৎ ও গভীর সম্পর্কই একজন মানুষকে সত্যিকারের হিদায়াতের পথে নিয়ে যেতে পারে।