প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ, সতর্কবার্তা, আশা ও সতর্কতার এক অনন্য সংকলন কোরআনুল কারিম। যুগে যুগে মানুষ এই মহাগ্রন্থ থেকে আলো গ্রহণ করেছে, নিজেদের জীবন বদলেছে, সমাজকে আলোকিত করেছে। কিন্তু একই কোরআন এমন কিছু মানুষের কাছেও পৌঁছেছে, যারা এর আহ্বান শুনেও তা গ্রহণ করেনি। বরং তাদের হৃদয়ে আরও বেড়েছে দূরত্ব ও বিমুখতা। এই গভীর বাস্তবতাই তুলে ধরা হয়েছে সুরা বনি ইসরাঈলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “এই কুরআনে বহু কথাই আমি বারবার বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে; কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।” এই আয়াত মানুষের মনস্তত্ত্ব, বিশ্বাস, অহংকার এবং সত্য গ্রহণের মানসিকতার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, একই সত্যকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা। কখনো সরাসরি উপদেশ দিয়ে, কখনো অতীত জাতির ইতিহাস বর্ণনা করে, কখনো উদাহরণ ও উপমার মাধ্যমে, আবার কখনো জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ভয়াবহতার বিবরণ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তি কোনো একঘেয়েমি নয়, বরং এটি মানুষের হৃদয়ে সত্যকে গভীরভাবে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য পদ্ধতি।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মানুষের মন একরকম নয়। কেউ যুক্তি দিয়ে সত্য গ্রহণ করে, কেউ আবেগ দিয়ে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, আবার কেউ ভয় বা আশার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। তাই কোরআন একই সত্যকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে, যাতে সব ধরনের মানুষ উপকৃত হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, সব মানুষ এই উপদেশ গ্রহণ করে না। বরং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা কোরআনের বাণী শুনে নিজেদের পরিবর্তন না করে, বরং আরও দূরে সরে যায়। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইসলামি ব্যাখ্যাকাররা বলেন, মূল সমস্যা কোরআনে নয়, বরং মানুষের অন্তরে।
যে হৃদয় সত্যের জন্য প্রস্তুত, কোরআন তার জন্য রহমত ও পথনির্দেশ। আর যে হৃদয় অহংকার, কুফর ও শিরকের অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তার জন্য কোরআনের বাণীও ফলপ্রসূ হয় না। বরং তারা এটিকে অস্বীকার করার নতুন নতুন অজুহাত খুঁজে নেয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কার মানুষদের কাছে কোরআনের বাণী পৌঁছে দেন, তখন কেউ তা শুনে ইসলাম গ্রহণ করে জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটায়। আবার কেউ এটিকে কবিতা, জাদু বা কল্পকাহিনি বলে উপহাস করে। একই বাণী, কিন্তু ভিন্ন প্রতিক্রিয়া—এটাই মানুষের অন্তরের পার্থক্যের প্রমাণ।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি পণ্ডিতরা একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন। তারা বলেন, কোরআনের বাণী বৃষ্টির মতো। বৃষ্টি যখন উর্বর জমিতে পড়ে, তখন সেই জমি সবুজ শস্যে ভরে ওঠে। কিন্তু একই বৃষ্টি যদি নোংরা ও দূষিত জমিতে পড়ে, তাহলে সেখানে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টির কোনো দোষ নেই, দোষ হলো জমির।
ঠিক তেমনি, কোরআন মানুষের অন্তরের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। যে হৃদয় সৎ, বিনয়ী এবং সত্যের অনুসন্ধানী, সে কোরআন থেকে পথনির্দেশ পায়। আর যে হৃদয় অহংকারী ও অস্বীকারকারী, সে আরও দূরে সরে যায়।
সমকালীন সমাজেও এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কোরআনের বাণী প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ পড়ছে, শুনছে এবং অনুসরণ করছে। অনেক মানুষ এই বাণী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের জীবন পরিবর্তন করছে, অন্যায়ের পথ ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসছে, মানবতার সেবা করছে।
অন্যদিকে, কিছু মানুষ এই একই বাণী শুনেও তা উপেক্ষা করছে। তারা এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, অথবা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
ধর্মীয় গবেষকরা মনে করেন, এর মূল কারণ হলো মানুষের নিয়ত ও মানসিকতা। যদি কেউ সত্য জানার জন্য আন্তরিক হয়, তাহলে কোরআন তার জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি কেউ পূর্বধারণা নিয়ে সত্যকে অস্বীকার করতে চায়, তাহলে সে কোরআন থেকেও উপকৃত হতে পারে না।
এই আয়াত মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সত্য গ্রহণের জন্য শুধু সত্যের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি প্রস্তুত হৃদয়। সত্য সবসময় মানুষের সামনে থাকে, কিন্তু সবাই তা গ্রহণ করে না।
একজন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ বলেন, কোরআন শুধু একটি বই নয়, এটি একটি আয়না। যে যেমন, সে তেমনই নিজের প্রতিফলন এতে দেখতে পায়। কেউ এতে নিজের ভুল দেখে সংশোধন করে, আবার কেউ নিজের ভুলকে অস্বীকার করে।
আজকের বিশ্বে, যেখানে মানুষ নানা সংকট, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে, সেখানে কোরআনের এই বাণী নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি মানুষকে আত্মসমালোচনা করতে, নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে এবং সত্যের পথে ফিরে আসতে আহ্বান জানায়।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোরআন শুধু পড়ার জন্য নয়, বোঝার জন্য; শুধু বোঝার জন্য নয়, অনুসরণ করার জন্য। কারণ কোরআনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনকে আলোকিত করা।
সবশেষে বলা যায়, কোরআনের বাণী সবসময় একই থাকে, পরিবর্তন হয় মানুষের মন। যে মন আলোর জন্য প্রস্তুত, সে আলো পায়। আর যে মন অন্ধকারে থাকতে চায়, সে অন্ধকারেই থেকে যায়। এই বাস্তবতা যুগে যুগে সত্য ছিল, আজও সত্য, এবং ভবিষ্যতেও সত্য থাকবে।