রমজান: সংযম ও সহমর্মিতার মাস, ভোগবিলাস নয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
রমজান: সংযম ও সহমর্মিতার মাস, ভোগবিলাস নয়

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজান মাস মুসলমানের জন্য কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার সময় নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভক্তি ও তাকওয়া অর্জনের মাস। মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা:১৮৩) অর্থাৎ, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো।

তবে বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে, আমরা কি সত্যিই রমজানকে সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে পালন করছি, নাকি এটি ভোগবিলাস ও সামাজিক প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতার একটি সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে? বিশেষ করে ইফতার আয়োজন এখন অনেক ক্ষেত্রে অপচয় ও বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার ইফতারের আয়োজন কতটা রঙিন ও সমৃদ্ধ তা প্রদর্শন করা যেন নতুন একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। রেস্তোরাঁ ও হোটেলে বিলাসী ইফতার আয়োজন, বাহারি খাবারের ছবি শেয়ার—সবই রমজানের প্রকৃত চেতনা থেকে মানুষকে বিচ্যুত করছে।

ইসলাম আমাদের শিখায়, খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে সংযম অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, “খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা আরাফ: ৩১) অপচয় শুধুমাত্র অর্থের নয়, খাদ্যের অপচয়ও গুনাহের কাজ। অনেক বাড়িতে ইফতারের পর তাজা খাবার ও বিশাল আয়োজনের অংশ সহজেই ডাস্টবিনে ফেলা হয়, যা রোজার মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে গেছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে অত্যন্ত সরল জীবনযাপনের অনুসারী ছিলেন। তিনি ইফতার করতেন খেজুর ও পানি দিয়ে। হাদিসে বর্ণিত, “রাসুলুল্লাহ ﷺ ইফতার করতেন রসিক খেজুর দিয়ে, না থাকলে শুকনা খেজুর এবং তা না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।” (সুনান আবি দাউদ: ২৩৫৬) এ সুন্নাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রমজানের প্রকৃত চেতনা হলো সংযম, বিলাসিতা নয়।

রমজান মাস আমাদের দরিদ্র ও অনাহারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়শই এমন ইফতার আয়োজন করি যা অনেক দরিদ্র মানুষের মাসিক আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কোরআনে উল্লেখ আছে, “তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের নির্ধারিত অধিকার রয়েছে।” (সুরা জারিয়াত: ১৯) অর্থাৎ গরিব ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি কেবল দয়া নয়, বরং এটি তাদের ন্যায্য অধিকার।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য দানের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। আল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিকে।” (সুরা দাহার:৮) রমজানে যখন আমরা ইফতারের জন্য বাহারি খাবারের আয়োজন করি, তখন কি আমরা আশেপাশের দরিদ্র মানুষের কথা ভেবেছি? রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, বিশেষ করে রমজানে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। (সহিহ বুখারি: ৬)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকে ইফতারকে সামাজিক প্রতিযোগিতার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অথচ রমজান মানে আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও তাকওয়া অর্জনের মাস। তাই প্রয়োজন পরিমিত ইফতার আয়োজন, অতিরিক্ত খাবার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ, সামাজিক প্রদর্শনী পরিহার, পরিবারের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দান-সদকার মাধ্যমে অপচয় রোধ।

রমজান কেবল পেট পূর্ণ করার মাস নয়, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার একটি মহান সুযোগ। ইফতারকে বাহারি ও অপচয়মুখী করার বদলে যদি আমরা দরিদ্র ও অভাবীদের কথা স্মরণ করি এবং তাদের ভাগ্য উন্নয়নে আমাদের অংশ প্রদান করি, তবে সেটিই রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য। সংযম, দানশীলতা এবং সহমর্মিতার মাধ্যমে রমজান মাস আমাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে।

সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা রমজানকে ভোগবিলাসের নয়, বরং সংযম, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার মাস হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। এটাই রমজানের প্রকৃত রুহ, যা আমাদের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়নের পথপ্রদর্শক। ইনশাআল্লাহ, এই শিক্ষা অনুসরণ করলে রমজান কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আমাদের জীবনে স্থায়ী নৈতিক পরিবর্তনের এক অনন্য সুযোগ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত