প্রকাশ: ১৬ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
“জুলাই শহীদরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার। তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই এখন আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”– এমন কথাই উচ্চারণ করলেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ বুধবার (১৬ জুলাই) প্রথমবারের মতো পালিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি এই ঐক্যের আহ্বান জানান।
জাতির এই শোকাবহ দিনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশের পথে দৃপ্ত পদভারে একযোগে সবাই এগিয়ে যাব—আজকের দিনে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।” তিনি মনে করিয়ে দেন, শুধু স্মরণ নয়—এই দিনটি যেন একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি হোক, শহীদদের রক্তের ঋণ শোধের প্রতিজ্ঞা হোক।
২০২৪ সালের এই দিনে, অর্থাৎ ১৬ জুলাই ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম, রংপুর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গুলিতে ও সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারান অন্তত ছয়জন। এরপর থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা বিলোপের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে রূপ নেয় স্বৈরাচারবিরোধী গণ-জাগরণে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে দীর্ঘমেয়াদি একদলীয় সরকারের।
প্রধান উপদেষ্টা তার বাণীতে বলেন, “জুলাই শহীদদের আত্মদান শুধু গণ-অভ্যুত্থানকে তীব্রতর করেনি, এটি জাতিকে যুগান্তকারী এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে—যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, থাকবে না দুর্নীতি, লুটপাট বা জবাবদিহিহীন ক্ষমতার অপব্যবহার।”
তিনি জানান, শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে গঠন করেছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদফতর’ ও ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। সেইসঙ্গে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত ও গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়াও, প্রতিটি শহীদ পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা ও মাসিক ভাতা প্রদানের পাশাপাশি আহতদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগই প্রমাণ করে—এই সরকার শহীদদের স্মৃতিকে শুধু অর্ঘ্য হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা হিসেবেও গ্রহণ করেছে।
দিবসটি ঘিরে আজ সারা দেশে পালন করা হচ্ছে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। মসজিদসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভা ও কর্মসূচিগুলোর মূল বক্তব্য ছিল—জাতি হিসেবে যেন আমরা আর কখনো বৈষম্য, স্বৈরতন্ত্র ও দুর্নীতির কাছে মাথানত না করি।
এই ঐতিহাসিক দিনে জাতির উদ্দেশে ড. ইউনূসের ভাষণ একদিকে যেমন শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের জন্য এক সুস্পষ্ট পথরেখাও টেনে দেয়—একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়।
জাতির এসব শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়—এই উপলব্ধিই আজকের ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর সারমর্ম। সেই পথেই সবাইকে নিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায়—এমনটাই প্রত্যাশা জাতির প্রধান উপদেষ্টার।