সাহরি: হাদিসে বর্ণিত বরকতময় সুন্নতের তাৎপর্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
সাহরি: হাদিসে বর্ণিত বরকতময় সুন্নতের তাৎপর্য

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। এই মাসে প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি ভালো কাজ এবং প্রতিটি সুন্নতের গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। রোজা পালনের ক্ষেত্রে সাহরি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা শুধু শারীরিক প্রস্তুতির অংশ নয়; বরং এটি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ একটি সুন্নত। ইসলামের ইতিহাস, হাদিস এবং আলেমদের ব্যাখ্যায় সাহরির গুরুত্ব এতটাই ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে যে, এটি রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত।

হাদিস শরিফে সাহরির গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর অন্যতম সাহাবি আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত রয়েছে।” এই হাদিসটি সংকলিত হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ সহিহ বুখারি-তে, যা ইসলামের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে বিবেচিত।

এই সংক্ষিপ্ত হাদিসের মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য। সাহরি শুধু একটি খাবারের সময় নয়, বরং এটি বরকতের সময়। ইসলামী চিন্তাবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন, সাহরির বরকত একাধিক দিক থেকে প্রকাশ পায়। প্রথমত, এটি রোজাদারের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা সত্ত্বেও সাহরি গ্রহণের মাধ্যমে একজন মুসলমান তার দৈনন্দিন কাজ, ইবাদত এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হন। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা ইবাদতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর সাহরি সেই শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

তবে সাহরির গুরুত্ব শুধু শারীরিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক দিক থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাহরির সময়টি মূলত রাতের শেষ অংশ, যা ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত। এই সময় আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফিরাত নাযিল হয় বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। অনেক মুসলমান এই সময় তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন, দোয়া করেন এবং ইস্তিগফার করেন। ফলে সাহরি এমন একটি সময়, যখন বান্দা একই সঙ্গে শারীরিক ও আত্মিক প্রস্তুতি নিতে পারেন।

ইসলামী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাহরি ছিল মহানবী (সা.)-এর নিয়মিত আমল। তিনি শুধু সাহরি খেতেনই না, বরং সাহরি বিলম্বে খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন। কারণ সাহরি যত শেষ সময়ে খাওয়া হয়, তত বেশি বরকত লাভের সম্ভাবনা থাকে। এর মাধ্যমে মুসলমানরা রাতের বরকতময় সময়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহরি মুসলমানদের রোজাকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের রোজা থেকে পৃথক করে। হাদিসে উল্লেখ আছে, মুসলমানদের রোজা এবং আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি। এর মাধ্যমে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য ও সুন্নতের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

সমাজের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক মানুষ সাহরিকে গুরুত্ব দেন না। কেউ কেউ শুধু রোজা রাখার উদ্দেশ্যে সাহরি এড়িয়ে যান অথবা খুব অল্প গুরুত্ব দেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, যা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করা উচিত নয়। এমনকি অল্প খাবার বা শুধু পানি পান করেও সাহরির সুন্নত পালন করা যায়।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও সাহরির গুরুত্বকে সমর্থন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করা জরুরি। এতে শরীরের শক্তি বজায় থাকে এবং ডিহাইড্রেশন বা দুর্বলতার ঝুঁকি কমে। ফলে সাহরি শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও উপকারী।

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাহরি একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। গভীর রাতে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন, একসঙ্গে খাবার গ্রহণ করেন এবং রোজার নিয়ত করেন। এই সময়টি পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে গভীর করে।

আলেমরা বলেন, সাহরির মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসুলের সুন্নতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এটি শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান বরকত লাভ করেন এবং তার রোজা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

রমজান মাসের প্রতিটি আমলই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সাহরি সেই আমলগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা সরাসরি রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত সাহরিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং এটিকে শুধু খাদ্য গ্রহণ হিসেবে না দেখে একটি বরকতময় সুন্নত হিসেবে গ্রহণ করা।

রমজান মূলত আত্মশুদ্ধির মাস, আর সাহরি সেই আত্মশুদ্ধির প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে শেখায়, সময়ের মূল্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাহরি শুধু রোজার একটি অংশ নয়, বরং এটি বরকত, রহমত এবং সুন্নতের এক অনন্য সমন্বয়। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে সাহরি পালন করেন, তিনি শুধু শারীরিক শক্তিই অর্জন করেন না, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সন্তুষ্টিও লাভ করেন। এই আমলের মাধ্যমে একজন মুসলমান তার রোজাকে আরও পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর এবং অর্থবহ করে তুলতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত