প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর। ইরানের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এর যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী নেতা নিহত হন। একই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনার পর পুরো ইরান জুড়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে “মহা অপরাধ” বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং ইরানের সার্বভৌমত্ব ও মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে আঘাত। খামেনির মৃত্যুতে দেশজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি ছুটি দেওয়া হয়েছে সাত দিনের। প্রতিবেশী ইরাকও তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। তেহরান, শিরাজ, লোরেস্তানসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে এবং প্রতিশোধের দাবি তুলেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারে দেখা গেছে, মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে হাজারো মানুষ শোক জানাতে জড়ো হয়েছেন।
ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে। মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং সেই তথ্য ইসরাইলকে দেওয়া হয়। অপরদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, হামলার সময় তেহরানের একটি সরকারি কম্পাউন্ডে ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়, যাতে পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরিকল্পনা ছিল রাতের অন্ধকারে হামলা চালানোর, কিন্তু দিনের বৈঠকের তথ্য পাওয়ার পর হামলার সময়সূচি বদলে দেওয়া হয়।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু শনিবার রাতে বলেন, খামেনি মারা গেছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পরে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ঘোষণা দেন, তারা কেবল অভিযান শুরু করেছে এবং আরও কয়েক দিন হামলা চালানো হবে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হামলায় অন্তত ৪০ জন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং গত ২৪ ঘণ্টায় আরও বহু স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মন্তব্য করেন, ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ব্যক্তিদের একজনের পরিণতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, পাল্টা হামলা না চালানোই তাদের জন্য ভালো হবে, নইলে এমন জবাব দেওয়া হবে যা অতীতে কেউ দেখেনি। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নয়টি জাহাজ ধ্বংস করেছে, যদিও এ দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাল্টা দাবি করেছে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকন-এ চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, তারা পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তিনটি মার্কিন ও ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনার সত্যতা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই না হলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশের আত্মরক্ষার কোনো সীমা নেই এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আত্মরক্ষার অধিকার থেকেই নেওয়া হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলাকে আগ্রাসন বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, জনগণকে রক্ষা করতে যা প্রয়োজন ইরান তা করবে। এই বক্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইল জানিয়েছে, তেল আবিবে প্রায় ৪০টি ভবন ধ্বংস হয়েছে এবং জেরুসালেমের পশ্চিমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদে আইনজ্ঞ আলিরেজা আরাফিকে সদস্য করা হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও বিচার বিভাগের প্রধানের সঙ্গে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর যেমন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হয়েছিল, এবারও তেমন একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে ইরান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া তীব্র। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, পাকিস্তানের জনগণ শোকাহত ইরানিদের পাশে রয়েছে। সামরিক জোট ন্যাটো জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইউরোপে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় বাহিনী সমন্বয় করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক থেকে শুরু করে কৌশলগত পরমাণু নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সবক্ষেত্রে তার অনুমোদন প্রয়োজন হতো। ফলে তার মৃত্যু শুধু নেতৃত্বের শূন্যতা নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধাক্কা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সূচনা ঘটাতে পারে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
তবে ঘটনাটির বহু দিক এখনো নিশ্চিতভাবে যাচাই হয়নি। বিশেষ করে হামলার প্রকৃত পরিসর, নিহতদের সংখ্যা এবং বিভিন্ন দেশের দাবি পাল্টা দাবির সত্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তথ্যযুদ্ধও এখন সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে তথ্য ব্যবহার করছে।
এদিকে তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া তাদের অধিকার এবং সময়মতো তারা তার জবাব দেবে। এই ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিমানের তৎপরতা বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।