প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র কোরআনুল কারিম মানব জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক উজ্জ্বল করার জন্য যে শিক্ষণীয় বাণী প্রদান করেছে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হৃদয়ের অন্ধত্ব। সুরা বনি ইসরাঈলের ৭২তম আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যে লোক ইহলোকে অন্ধ, সে লোক পরলোকেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।” এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, প্রকৃত অন্ধত্ব শুধুমাত্র শারীরিক নয়; বরং অন্তরের অন্ধত্বই হলো সবচেয়ে ভয়াবহ এবং পথভ্রষ্ট অবস্থা।
যে ব্যক্তির মন ঈমান ও হক্ক বুঝতে অক্ষম, সে বাইরের পৃথিবীকে দেখলেও প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। এই ধরনের লোকরা নিদর্শন ও আল্লাহর দিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে এবং তাদের অন্তর সত্যকে স্বীকার করতে অস্বীকার করে। কোরআনের অন্যান্য আয়াতেও এ বিষয়কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, চোখ শারীরিকভাবে অন্ধ না হলেও অন্তরের অন্ধত্ব তাদেরকে প্রকৃত সত্য দেখায় না। সূরা আল-হাজ্বের ৪৬তম আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা চোখ দিয়ে দেখেও বুঝতে চায় না, তারা বাস্তবে হৃদয় দ্বারা অন্ধ। অর্থাৎ, অন্তরেই তাদের অন্ধত্ব বিদ্যমান।
আয়াতের অর্থ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, যারা দুনিয়ার জীবনে অন্ধ হয়ে যান কিন্তু ঈমানদার ও ধৈর্যশীল হন, তাদের জন্য কোরআন ও হাদিসে প্রশংসার বাণী আছে। সূরা আবাসার ১–৩ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা ভ্রকুঞ্চিত ও মুখ ফিরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত অন্ধ ব্যক্তি যদি ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে, তবে তার জন্য রয়েছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও নৈতিক উন্নতি।
কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, আখেরাতে অন্ধত্বের দুটি ব্যাখ্যা আছে। এক, কেউ শারীরিকভাবে অন্ধ অবস্থায় হাশরের দিন উপস্থিত হতে পারে। এর সমর্থনে আল্লাহ বলেন, যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করা হবে অন্ধ অবস্থায়। অন্যথায়, আয়াতের আরেক অর্থ হলো, যারা দুনিয়ার জীবনে হক্কের নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছে, তাদেরকে আখেরাতে সেই সব প্রমাণ ও নিদর্শন থেকে অন্ধ করে তোলা হবে, যা মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ অনুমোদন করেছেন। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের অন্তরের অবস্থা আখেরাতেও প্রতিফলিত হয়।
এই আয়াতের মাধ্যমে কোরআন আমাদেরকে সতর্ক করছে যে, দৃষ্টিশক্তি দিয়ে সবকিছু দেখা যথেষ্ট নয়। অন্তরের দৃষ্টিশক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি ও ঈমানের মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে। যারা নিজের অন্তরের দৃষ্টিকে উন্নত করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে সঠিক পথে চলতে পারে। অন্যদিকে, যারা অন্তরের অন্ধত্বকে প্রশ্রয় দেয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।
কোরআনের বাণী মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে নিরন্তর প্রেরণা দেয়। এটি আমাদেরকে শেখায় যে, শুধু চোখের মাধ্যমে নয়, হৃদয়ের মাধ্যমে সত্য ও ন্যায়কে উপলব্ধি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা অন্তরের অন্ধত্ব কাটিয়ে ওঠে এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে, তাদের জন্য রয়েছে প্রশান্তি, জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং জীবনের নৈতিক উন্নতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আয়াত মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে। হৃদয় যদি অন্ধ থাকে, তাহলে ব্যক্তি যেকোনো বাহ্যিক জ্ঞান ও তথ্য গ্রহণ করলেও তা তাকে উপকার করবে না। অন্তরের জ্ঞান, আল্লাহর ভীতি এবং নৈতিক বোধই প্রকৃত জীবনদর্শন তৈরি করে। কোরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে অন্ধ রাখে, সে বাস্তব জীবনের সমস্ত সুযোগ ও দিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে।
সুতরাং, কোরআনের এই আয়াত ও এর ব্যাখ্যা আমাদেরকে অন্তরের উন্নতি ও আত্মচিন্তার প্রতি উদ্দীপিত করে। এটি শুধু নৈতিক শিক্ষা নয়, বরং আধ্যাত্মিক সচেতনতারও নির্দেশ। অন্তরের অন্ধত্ব কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমে মানুষ সঠিক পথকে বেছে নিতে সক্ষম হয় এবং নিজের জীবনকে আল্লাহর আনন্দ এবং ন্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে পারে। এই আয়াত আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত অন্ধত্ব শারীরিক নয়, বরং অন্তরের অবস্থায় নিহিত, যা দূর করার জন্য মানুষকে সচেতন ও উদ্যমী হতে হবে।