প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও হয়রানিমূলক মামলার সংস্কৃতি ফিরে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, অতীতে যেমন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে মামলা ব্যবহার করা হয়েছে, তেমন প্রবণতা আবারও দেখা যাচ্ছে। তার দাবি, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে করা মামলাটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রোববার বরিশালের হালিমা খাতুন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এনসিপির বরিশাল বিভাগীয় ইফতার ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সমাবেশে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাও হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এবং স্থানীয় সমর্থকদের সামনে নাহিদ ইসলাম দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, মামলা-রাজনীতি এবং আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে এবং তাদের কণ্ঠ রোধ করতে মামলাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা দেশের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, এখন আবার একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
নাহিদ ইসলাম বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, একটি রাজনৈতিক কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হিসেবে এই মামলা করা হয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপে কোনো লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, একজন পাটওয়ারীর মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ঘরে ঘরে আরও পাটওয়ারী তৈরি হবে।
রাজনৈতিক বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, তারা বিএনপিকে কখনোই আওয়ামী লীগের মতো দেখতে চান না। তার মতে, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির দাবি করে এসেছে এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে তাদের নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে কিংবা দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের আশ্রয় দেয়, তাহলে জনগণের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক আন্দোলন হয়েছে যেখানে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা একসঙ্গে রাজপথে লড়াই করেছে। সেই লড়াইয়ের স্মৃতি এখনও অনেক মানুষের মনে আছে। তাই তিনি আশা করেন, গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সৎ থাকবে।
তার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা। তিনি বরিশাল বিভাগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে নানা ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, সেই কারণে তাদের দলের অনেক সম্ভাবনাময় প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। তবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কারচুপি বা অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট করে দেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তারা কঠোর অবস্থানে থাকবে। নির্বাচনে যদি অনিয়মের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
ইফতার ও দোয়া মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার আহ্বানও জানান। তার মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য সংগঠিত ও সচেতন থাকা জরুরি।
অনুষ্ঠানে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলামসহ আরও অনেক নেতা।
অনুষ্ঠানে নেতারা রমজানের তাৎপর্য তুলে ধরে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তারা।
বরিশাল বিভাগে আয়োজিত এই ইফতার মাহফিলকে দলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় এমন আয়োজনের মাধ্যমে। ফলে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে নির্বাচন, মামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করছে।
তাদের মতে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকলেও আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যও সেই চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার অভিযোগ এবং মন্তব্য নিয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণের কার্যক্রমও বাড়ছে। দলগুলো মাঠ পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বরিশালের ইফতার মাহফিলে দেওয়া বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশের মন্তব্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।