
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদারের লক্ষ্যে চীনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রথম বিদেশি অফিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যেই চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে এ অফিস কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানিয়েছেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
সংশ্লিষ্ট এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যেই দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো বিডার অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চীনকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি দেশটির বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।
আশিক চৌধুরী বলেন, “চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ উৎস। বাংলাদেশে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সেবা প্রদানের জন্য সেখানে বিডার একটি স্থায়ী উপস্থিতি প্রয়োজন।”
তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, নীতিগত সহায়তা, প্রকল্প-সংক্রান্ত পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপনের কাজ করবে এই অফিস। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাতগুলো সম্পর্কে চীনা উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রচারণা চালানো হবে।
বিডা চেয়ারম্যানের মতে, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক দেশ ইতোমধ্যে বিদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রচার অফিস স্থাপন করেছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথে এগোচ্ছে। এর ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তথ্য ও সেবা পাবেন, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে উৎপাদন, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চীনে বিডার অফিস চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন। নতুন অফিস সেই ব্যবধান কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইনের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন বাজারের সন্ধানে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিকল্প গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আশিক চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু প্রচারণা নয়, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নেও কাজ চলছে। ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করা, সেবার ডিজিটালাইজেশন, অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় কমানো এবং একক জানালা সেবা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চীনে অফিস চালুর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রেও বিডার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি, সেসব অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে অফিস স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, চীনে বিডার অফিস স্থাপন একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে পরিচালিত অনেক বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পে চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করছেন, বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণেও এই উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করলেই হবে না; বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত সুবিধা, দক্ষ জনশক্তি এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
তারা বলেন, চীনে বিডার প্রথম বিদেশি অফিস চালু হওয়া প্রতীকী গুরুত্বও বহন করে। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাজারে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতির নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই অফিসটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।