
ভারত সফর থেকে ফিরে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার না করার বিষয়টি নিয়ে চলমান আলোচনা ও বিভিন্ন জল্পনার জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দিল্লি বিমানবন্দরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে কূটনৈতিক পাসপোর্টের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং অন্য কিছু কারণে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার রাজধানীতে তথ্য অধিদফতরে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক ভারত সফর ঘিরে নানা আলোচনার প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক মহলে আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি এখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। তবে এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ নেই। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিষয়টি আটকে ছিল এবং সময়মতো তা নেওয়া হয়নি। তিনি জানান, তার ব্যবহৃত পাসপোর্টে সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ অনুমোদন বা স্টিকার সংযুক্ত ছিল। ফলে ভ্রমণ-সংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকাটা কোনো বাধা হওয়ার কথা নয়।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ তার ভারত সফরে জটিলতার কারণ হিসেবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকার বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি বলেন, বিদেশ সফরে যাওয়ার জন্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক নয় এবং সরকারি দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই এমন পাসপোর্ট নিতে হবে—এমন কোনো বিধানও নেই।
তিনি আরও বলেন, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রয়োজন হলে তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিতে পারেন, আবার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে তা না-ও নিতে পারেন। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যেসব ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি মনে করেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ডা. জাহেদ উর রহমানের। সফরের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আগাম অবহিতও করা হয়েছিল। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো হয় বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তার সঙ্গে সরাসরি দুর্ব্যবহার করা হয়েছে এমনটি তিনি বলতে চান না। তবে তার সরকারি মর্যাদা অনুযায়ী যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি। তিনি পরিস্থিতিকে আরও জটিল বা উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে চাননি বলেও জানান।
তার ভাষায়, ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এজন্য তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সফর চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানিয়েছিল বলে জানা যায়, তবুও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, চাইলে পুরো বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া যেত। কিন্তু বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি মনে করেন, সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই ছিল সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রে প্রোটোকল ও মর্যাদার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি বিদেশ সফরে গেলে আগাম যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে তার প্রবেশ ও অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে একটি প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
তবে তথ্য উপদেষ্টা তার বক্তব্যে পরিষ্কার করেছেন, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকা কোনোভাবেই ওই ঘটনার মূল কারণ ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার পর ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের সফরের ক্ষেত্রে সমন্বয় ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে বিদেশ সফরে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের মর্যাদা ও প্রোটোকল নিশ্চিত করার বিষয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ডা. জাহেদ উর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইস্যুতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর কূটনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।