প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মূল দাবি সামনে রেখে এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে এবার বিভাগভিত্তিক লংমার্চের কর্মসূচি চালুর গুরুত্বসহকারে চিন্তা করছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনকে আরও বেগবান ও জনমুখী করার লক্ষ্যে জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এই বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে অর্থাৎ আগামী ২৯ কিংবা ৩০ আগস্টের মধ্যে এই লংমার্চ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে বলে জোটের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী জোটের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে নানান সমীকরণ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের সাংবিধানিক সংস্কার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা অক্ষুণ্ণ রাখতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে এই বিরোধী জোট। এর আগে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে ধারাবাহিক সমাবেশ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর, গত ৩০ জুলাই রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপের রূপরেখা নির্ধারণের অংশ হিসেবে বিভাগভিত্তিক লংমার্চের পাশাপাশি প্রতিটি লংমার্চের পথে পথসভা, জনসভা, রাজধানীতে বিশাল মহাসমাবেশ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত লড়াকু যোদ্ধাদের সম্মানার্থে পৃথক আলোচনা সভার জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়েছে। জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অভিমত, এ ধরনের বহুমুখী ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা ও আলোচনার রূপরেখা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ঢাকা থেকে শুরু করে খুলনা, চট্টগ্রাম এবং রংপুর বিভাগে এই লংমার্চ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। প্রতিটি লংমার্চের যাত্রাপথে একাধিক স্থানে পথসভা ও জনসভার আয়োজন করা হবে, যাতে স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যায়। প্রথম ধাপের কর্মসূচি সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ বিভাগেও একই ধরনের লংমার্চ ও জনসমাবেশ করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে জোটের নীতিনির্ধারকদের। পূর্বে আগামী অক্টোবর মাসে ঢাকায় একটি বিশাল মহাসমাবেশ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থাকলেও, লংমার্চের এই নতুন কর্মসূচিগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে সেই মহাসমাবেশ কিছুটা পিছিয়ে আগামী নভেম্বর মাসে গড়াতে পারে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে জোটের নেতারা দীর্ঘ সময় ধরে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিক গতি ধরে রাখতে চান।
বিরোধী জোটের একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন যে, তাঁদের আন্দোলনের মূল ভিত্তি জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেও, বর্তমান জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নানান বাস্তব সমস্যাও তাঁদের কর্মসূচিতে সমানভাবে গুরুত্ব পাবে। দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, তীব্র লোডশেডিং, গ্যাস–সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থান সংকট এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জনদুর্ভোগের বিষয়গুলোকে তাঁরা রাজপথের বক্তব্যে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন। জনগণের প্রাত্যহিক ও মৌলিক সমস্যাগুলো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলে এর সামাজিক ভিত্তি আরও অনেক বেশি প্রশস্ত হবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের সাংগঠনিক তৎপরতা ও দৃশ্যমান উপস্থিতি ধরে রাখাও এই বৃহত্তর কর্মপরিকল্পনার একটি অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করলেও তা কোনোভাবেই সহিংস বা নৈরাজ্যমূলক হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ১১–দলীয় জোটের দায়িত্বশীল নেতারা। তাঁরা পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, দাবি আদায়ের লক্ষে কোনো ধরনের জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল বা ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির পথে পা বাড়াবে না বিরোধী জোট। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক গণ-আন্দোলন ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমেই সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায় করা হবে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানান যে, ধারাবাহিক কর্মসূচিগুলোতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া মিললেও সরকার এখনও কাঙ্ক্ষিত দাবিগুলো বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এই বাস্তব প্রেক্ষাপটেই আন্দোলনকে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লংমার্চ ও মহাসমাবেশের মতো কর্মসূচিগুলোর পরিকল্পনা চলছে। জোটের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই পরবর্তী চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।