চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যজট, আটকে আছে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আমদানিকৃত পণ্যের জট এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়ার্ডে পড়ে থাকা কনটেইনার ও পণ্যের কারণে বন্দরের কার্যক্ষমতার একটি বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে জাহাজ খালাসে বিলম্ব, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বন্দরের ইয়ার্ডে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ টিইইউ কনটেইনার আটকা পড়ে ছিল। এসব কনটেইনার বন্দরের মোট ইয়ার্ড সক্ষমতার প্রায় ২২ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে। তবে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাবে, প্রশাসনিক জটিলতা, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি সমস্যার কারণে আটকে থাকা পণ্যের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।

ব্যবসায়ীদের ধারণা, দীর্ঘদিন আটকে থাকা এসব পণ্যের মূল্য ২০০ কোটি ডলারের বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কনটেইনার ব্যবহারের ক্ষতি, শিপিং কোম্পানির লোকসান, বন্দর রাজস্ব ঘাটতি এবং কাস্টমসের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এই জটের প্রভাব ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিষয়টি জানিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছে। বন্দরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।

সিপিএর পক্ষ থেকে এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনারের কারণে বন্দর ইয়ার্ডের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। এর ফলে নতুন কনটেইনার গ্রহণ, জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো এবং রপ্তানি কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্দরের আয়ও কমে যাচ্ছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইয়ার্ডে বিপুল পরিমাণ এলসিএল কার্গো, খোলা পণ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য পড়ে রয়েছে। এসব পণ্যের কিছু অংশ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্দরে আটকে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকার কারণে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে এবং পরিবেশ ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কাস্টমস প্রক্রিয়ার ধীরগতি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নথিপত্র যাচাই এবং আইনি জটিলতা শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এর মধ্যে প্রতিদিন বাড়তে থাকে স্টোরেজ চার্জ ও ডেমারেজ।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমস মূল্যায়ন শেষ হতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগে। অথচ নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকেই ব্যবসায়ীদের জরিমানা গুনতে হয়। এতে আমদানিকারকদের মূলধন আটকে যায় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই সমস্যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বড় কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারলেও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘদিন বন্দরে পণ্য আটকে থাকা অনেক সময় ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা রক সল্টের চালান। মাত্র ৬ হাজার ৪৪০ ডলারের পণ্যটি খালাসে বিলম্ব হওয়ায় ডেমারেজ ও অন্যান্য চার্জ বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ পণ্যের মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ জমেছে শুধু প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে।

আরেকটি কনটেইনার প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্দরে পড়ে আছে। ২০২১ সালে আসা প্লাস্টার অব প্যারিসের ওই কনটেইনারের বিপরীতে জমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ডলারের বেশি বন্দর মাশুল। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে শিপিং কোম্পানির জন্যও সেটি আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

কনটেইনার জটের কারণে শুধু বন্দর নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোও। দীর্ঘদিন কনটেইনার বন্দরে আটকে থাকায় সেগুলো অন্য রুটে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কনটেইনারের কার্যকর ব্যবহার কমছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

এদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দরে থাকা সব কনটেইনার আইন অনুযায়ী সরাসরি নিলামে তোলা সম্ভব নয়। অনেক চালান মামলা, আদালতের আদেশ, তদন্ত বা মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আটকে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েক হাজার কনটেইনার নিলামযোগ্য ছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো ইতোমধ্যে নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং কিছু পণ্য ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে সব পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট সমাধানে বন্দর, কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন আটকে থাকা পণ্যের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তাঁদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এই বন্দরের কার্যক্ষমতা কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি দেশের শিল্প, আমদানি-রপ্তানি এবং ভোক্তা বাজারে পড়ে। তাই দীর্ঘদিনের পণ্যজট দূর করা শুধু বন্দরের সমস্যা সমাধান নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির গতি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত