প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ভূমি সেবা খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি, অনিয়ম এবং সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর ভূমি অফিসের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে একযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সোমবার সকালে গাজীপুর জেলার জেলা প্রশাসকের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আকস্মিক ঝটিকা অভিযানের পরই এই কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন ভূমি অফিস ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ, হতাশা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, কাশিমপুর ভূমি অফিসের এই আকস্মিক ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ সেই জায়গায় এক অন্যরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খবর নিয়ে জানা গেছে যে, সোমবার সকালে গাজীপুর জেলার জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূইয়ার নেতৃত্বে প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের টিম কাশিমপুর ভূমি অফিসে পূর্বঘোষণা ছাড়াই হানা দেয়। এই বিশেষ অভিযানে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব, সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের অন্যান্য দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। হঠাৎ করে জেলা প্রশাসক ও শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভূমি অফিসে উপস্থিত হলে সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে এক ধরণের আতঙ্ক ও হুলস্থূল কাণ্ড শুরু হয়। সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা নানা অভাব-অভিযোগ ও হয়রানির কথা জেলা প্রশাসকের কাছে সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পান।
অভিযান চলাকালে জেলা প্রশাসক কাশিমপুর ভূমি অফিসে উপস্থিত সেবাগ্রহণকারী সাধারণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং তাদের মুখ থেকে সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তির করুণ চিত্র শোনেন। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেন যে, সামান্য নামজারি, খতিয়ান বা ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা দিতে হতো এবং দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলত না। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত এসব গুরুতর অভিযোগের পাশাপাশি ওই ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম, ফাইলপত্র ও রেজিস্টারগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেন জেলা প্রশাসক। প্রাথমিক তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ে সাধারণ মানুষের করা অভিযোগগুলোর সত্যতা মিললে তাৎক্ষণিকভাবে অফিসের ভেতরেই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাশিমপুর ভূমি অফিসে কর্মরত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূইয়া গণমাধ্যমকে এই অভিযানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান যে, গত বেশ কিছুদিন ধরে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে কাশিমপুরসহ বিভিন্ন ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিত আকারে জেলা প্রশাসনের কাছে এসে পৌঁছাচ্ছিল। জনগণের মৌলিক অধিকার ও প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদেরকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত ভূমি সেবা প্রদান নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আজকের এই হঠাৎ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান কোনোভাবেই থেমে থাকবে না, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। গাজীপুর জেলার যেখানেই সাধারণ মানুষের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া যাবে, সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য-প্রমাণাদি যাচাই-বাছাই করে জিরো টলারেন্স নীতিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে কাশিমপুর ভূমি অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একযোগে বরখাস্ত করার এই যুগান্তকারী ও সাহসিকতাপূর্ণ খবরের সুবাতাস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় এলাকাবাসী এবং দূরদূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। দীর্ঘকাল ধরে সরকারি অফিসের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ জেলা প্রশাসকের এই তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপে দারুণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারা প্রকাশ্যেই জেলা প্রশাসকের এই সাহসী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরণের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যান্য সরকারি অফিসগুলোর অসাধু ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সাবধান হবে। সেবাগ্রহীতারা মনে করছেন, ভূমি খাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টরে এই ধরণের কঠোর প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান দেশের সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এক মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।