প্রকাশ: ১৭ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পূর্বনির্ধারিত পদযাত্রা ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা আসলে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি—এমনই মন্তব্য করেছেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অংশগ্রহণ করে তিনি বলেন, “এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধি লাগে না যে গোপালগঞ্জে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।”
জাহেদ উর রহমান বলেন, গোপালগঞ্জে যা ঘটেছে, তা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি হতে পারে একটি পরিকল্পিত পরিস্থিতি। তার ভাষায়, “এনসিপির যেসব নেতা গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের প্রতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশ রয়েছে।” তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তাঁর একাধিক বক্তব্যে এনসিপি নেতাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন—এমনকি সমন্বয়ক নেতার শ্বশুরবাড়িও খুঁজে বের করার কথা বলেছেন। এর মধ্যেই প্রতিফলিত হয়, এই নেতাদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষোভ কতটা গভীর।
সারাদেশে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির মধ্যে গোপালগঞ্জকে ঘিরে কেন এমন উত্তেজনা, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “গোপালগঞ্জে এনসিপির যে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ছিল, তার নামটিই কিছুটা উসকানিমূলক বলে অনেকে মনে করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকা মন্তব্যগুলোও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে।”
জাহেদ উর রহমানের পর্যবেক্ষণে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে—যেমন, টুঙ্গিপাড়া ভেঙে দেওয়ার কথা বা এনসিপিকে ‘অসাধারণ রাজনৈতিক দল’ প্রমাণ করার উত্তেজনামূলক অভিব্যক্তি। এই ধরনের উসকানিমূলক বার্তাগুলো সেখানকার পরিবেশকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, “এই ঘটনার পেছনে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, এটি সরকারই পরিকল্পিতভাবে ঘটতে দিয়েছে। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এত তথ্যভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও তারা কেন এই সহিংসতার আশঙ্কা আঁচ করতে পারলো না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আমরাও তো বুঝতে পারছিলাম, সেখানে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।”
জাহেদ উর রহমান এই ঘটনার সঙ্গে একটি কৌশলগত রাজনীতির বিষয়ও যুক্ত করেন। তার মতে, এনসিপি হয়তো এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তেই চেয়েছে, যাতে তারা নিজেদেরকে নিপীড়িত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহানুভূতি আদায় করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে একটি স্বৈরাচারী চেহারায় উপস্থাপন করাও হতে পারে এই কৌশলের অংশ।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, “ঘটনার পরপরই এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ বলেছেন—এর মধ্যে কেমন করে নির্বাচন হবে? এর মানে হচ্ছে, এই সহিংসতা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার পথও তৈরি করছে।”
জাহেদ উর রহমান মনে করেন, “সরকার যদি সত্যিই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইত, তবে তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামর্থ্য দিয়ে আগেই ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি, বরং হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে—যা আমাদের চিন্তার আরও গভীর স্তরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে।”
এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাহেদ উর রহমান আসলে শুধু একটি সহিংস ঘটনার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেননি, বরং তিনি তাৎপর্যময় একটি প্রশ্ন রেখেছেন রাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় নিয়ে। গোপালগঞ্জের ঘটনাকে কেবল একটি সহিংসতা হিসেবে দেখলে হয়তো ভুল হবে—এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক চাল বা ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।