“আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই”, গোপালগঞ্জে নিহত কিশোর ইমনের পরিবারের আহাজারি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫
  • ২৮ বার

নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫

গোপালগঞ্জের ভেড়ার বাজার গ্রামের আজাদ তালুকদারের ছোট টিনের ঘরটিতে এখন শুধুই কান্নার রোল। একসময় যেখানে গরিবি ঘেরা জীবনের হাসি–আশার আলো থাকত, এখন সেখানে গভীর শোক আর অসহায়তার স্তব্ধতা। গতকাল বুধবার গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো ১৭ বছর বয়সী ইমন তালুকদারের মৃত্যুর পর এই বাড়িটি যেন হয়ে উঠেছে এক শোকসাগর।

বৃহস্পতিবার সকালে বাড়িতে গেলে দেখা যায়, উঠানে ভিড় জমিয়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কেউ বিলাপ করছেন, কেউ নীরবভাবে কাঁদছেন। উঠানের এক কোণে বসে আছেন ইমনের মা রোকসানা বেগম, মুখে কোনো কথা নেই—শুধু কাঁপা চোখ, ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। একসময় ব্যথাকাতর গলায় বলে উঠলেন, “এখন আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই… ছাওয়াল মরসে শুইনা ওর বাপ পাগল হইয়া চইলা গেছে… আমার বাপে সংসারটা টানত। এখন আমার কিছুই নাই।”

নিহত ইমন ছিল পরিবারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল সন্তান। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। বড় ভাই অসুস্থ, অন্যরা এখনো পড়াশোনা করে। বাবা আজাদ তালুকদারও রোগে ভুগছেন। কোনো রকমে ভ্যান চালিয়ে সংসার চলত। প্রতিবেশী রাজু তালুকদার বলেন, “ইমনই ছিল এই পরিবারের ভরসা। মুন্সি ক্রোকারিজ নামের একটি দোকানে চাকরি করত। দোকান থেকে সামান্য বেতনে চলত তাদের দিন। গতকাল দোকান থেকে দেড়শ টাকা পেয়ে ফিরে যাবার কথা থাকলেও, সে আর ঘরে ফিরলো না।”

দোকান মালিকের দেয়া তথ্যমতে, ইমন গতকাল সকালে দোকানে গিয়ে কাজ করছিল। বেলা ১১টার দিকে মালিক তাকে সাময়িক ছুটি দেন, বলেছিলেন বাড়ি চলে যেতে। কিন্তু ইমন সরাসরি বাড়ি না গিয়ে কিছুটা দূরে সংঘর্ষস্থলে কী কারণে যেন উপস্থিত হয়। তখনই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে ইমন গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে মারা যায়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় শহরের গেটপাড়ার পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। কিন্তু সেই দাফনে ছিলেন না তার পিতা। ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছেন, কেউ জানে না। স্বজনদের ভাষায়, “তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। ছেলের লাশ দেখার সাহসও হয়নি। পাগলের মতো দৌড়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন।”

ইমনের মা বারবার বলছেন, “আমার ছেলেরে যেমন গুলি করে মাইরেছে, আমি তার বিচার চাই। আমার সংসার ভাঙসে, আর কেউ নাই।”

গরিব এই পরিবারের ওপর এমন এক মর্মান্তিক দুঃসংবাদ যেন ধ্বংস করে দিয়েছে একটি জীবনের সব স্বপ্ন, এক মায়ের আশা। ইমনের মৃত্যু শুধু এক তরুণের প্রাণনাশ নয়, একটি পরিবারের অস্তিত্ব সংকটও। এলাকাবাসী এবং প্রতিবেশীরা এই ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, “এই রকম নিরীহ ছেলেরা যদি রাজনীতির বলি হয়, তাহলে কে নিরাপদ?”

ইমনের মৃত্যু এখন কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নচিহ্ন—এই সহিংস রাজনীতির শেষ কোথায়? কে দেবে এই মায়ের বিচার, কে ফিরিয়ে দেবে তার সংসার?

শোকাহত মা রোকসানা বেগমের আর্তনাদ আর প্রতিবেশীদের কান্না মিলেমিশে যেন গোটা সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করছে—এই মৃত্যুর দায় কি শুধুই গুলির? না কি আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই মৃত্যুর ভাগীদার?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত