ঈদযাত্রায় আবারও শঙ্কা এলেঙ্গা–যমুনার ১৩ কিলোমিটার সড়ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার
টাঙ্গাইল-ঢাকা-যমুনা সেতু মহাসড়কে এবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সেই ১৩ কিলোমিটার রাস্তা।

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গমুখী মানুষের ঘরমুখো যাত্রা ধীরে ধীরে শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও সেই যাত্রাপথে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার সড়ক। ঢাকা–টাঙ্গাইল–যমুনা সেতু মহাসড়কের এই অংশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বরং এলেঙ্গা এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা–টাঙ্গাইল–যমুনা সেতু মহাসড়ক উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর অন্যতম প্রধান সড়ক যোগাযোগের পথ। এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। বিশেষ করে ঈদের সময় এ সড়কে গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ায় ওই অংশে এখন যানবাহন চলাচল অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। উত্তরবঙ্গসহ অন্তত ২৪টি জেলার মানুষ নির্বিঘ্নে এই অংশ দিয়ে চলাচল করতে পারছেন। কিন্তু এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার অংশের উন্নয়নকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

গত তিন বছর ধরে ঈদযাত্রার সময় এই অংশে কয়েক ঘণ্টা ধরে যানজটের ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির দীর্ঘ সারি কখনো কখনো কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনে থাকা যাত্রীরা অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মুখে পড়েন। তীব্র গরম, যানবাহনের ধোঁয়া এবং দীর্ঘ অপেক্ষা মিলিয়ে যাত্রাপথ হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

এবারের ঈদযাত্রায় সেই দুর্ভোগের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে এলেঙ্গা এলাকায় চলমান ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ। সেখানে ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ চলছে। নির্মাণকাজের কারণে সড়কের কিছু অংশে লেন সংকুচিত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের মাঝখানে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। এসব কারণে স্বাভাবিক সময়েই অনেক সময় যানবাহন ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়। ঈদের সময় যখন কয়েকগুণ বেশি যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করবে, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এলেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ জোরেশোরে চলছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকরা কাজ করছেন এবং নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে আন্ডারপাস নির্মাণের কাজও চলছে। এসব কাজের কারণে সড়কের স্বাভাবিক গতি অনেকটাই কমে গেছে।

নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস ধরে এখানে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়ায় দিন-রাত কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। তবে কাজ পুরোপুরি শেষ হতে আরও কিছু সময় লাগবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার পরিবহন চালকদের মধ্যেও এই সড়ক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। হানিফ পরিবহনের চালক হেলাল মিয়া জানান, গত কয়েক বছর ধরেই এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। এর ফলে প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়। ঈদের সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ঈদ এলেই হঠাৎ করে কাজের গতি কিছুটা বাড়ানো হয়, কিন্তু ঈদ শেষ হলেই আবার কাজের গতি কমে যায়। এতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।

ঐতিহাসিকভাবে যমুনা সেতু উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তখন সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ হাজার যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সেতুর দুই প্রান্তে চারটি টোল বুথ ছিল এবং সেগুলো দিয়ে প্রায় দুই হাজার যানবাহন পারাপার হতো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে যমুনা সেতুর দুই প্রান্তে মোট ১৪টি টোল বুথ রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ২২ হাজারের বেশি যানবাহন পারাপার হয়। তবে ঈদের সময় এই সংখ্যা বেড়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজারে পৌঁছে যায়। এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করায় সেতুর দুই প্রান্তে এবং আশপাশের মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

মহাসড়কের উন্নয়নকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রবিউল আওয়াল বলেন, প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তাই কাজ সম্পন্ন করার জন্য আরও এক বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঈদযাত্রার সময় যানজট কমানোর জন্য উত্তরবঙ্গগামী সার্ভিস লেন খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক রয়েছে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ। ইতোমধ্যে ঈদকে সামনে রেখে অনেক মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে পুলিশের ধারণা, আগামী ১৬ মার্চ থেকে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে ১৭ ও ১৮ মার্চ হবে সবচেয়ে বেশি চাপের সময়।

গত ঈদে এই মহাসড়কে কয়েকটি আলোচিত ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল, যা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে মহাসড়কে এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি নিয়মিত টহল জোরদার করা হবে এবং সন্দেহজনক যানবাহন তল্লাশি করা হবে।

তিনি আরও জানান, ফিটনেসবিহীন কোনো যানবাহন মহাসড়কে চলতে দেওয়া হবে না। এছাড়া যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য প্রস্তুত রাখা হবে।

সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য ঈদযাত্রা এবারও স্বস্তির বদলে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সেই ১৩ কিলোমিটার সড়ক। উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়া, নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক।

তবুও আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা, প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং চলমান উন্নয়নকাজের কিছু অগ্রগতি ঈদযাত্রার দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমাতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয় এবং লাখো মানুষের ঘরমুখো যাত্রা কতটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত