প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মো. সাহারোজ আরেফিন গলিব (১৯) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে গেছে। শুক্রবার রাতের একটি স্বাভাবিক ঘোরাঘুরি মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুর করুণ ঘটনায়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেড়াতে আসা মামার মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিল তরুণ এই শিক্ষার্থী। কিন্তু বাসায় ফেরার আগেই নাগদারপাড় এলাকায় মোটরসাইকেল স্লিপ করে পড়ে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে খিলগাঁওয়ের নাগদারপাড় এলাকায়। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
নিহত সাহারোজ আরেফিন গলিব রাজধানীর ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার পরিবার খিলগাঁওয়ের বনশ্রী এল ব্লকে বসবাস করত। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার বাবা শামসুল আরেফিন কুয়েত প্রবাসী এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মরত। পরিবারের সদস্যদের আশা ছিল, গলিব উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হবেন এবং পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করবেন। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই সব স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে।
নিহতের চাচা জহিরুল ইসলাম কলিম জানান, সাহারোজের মামা কয়েকদিন আগে ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। তার সঙ্গে মোটরসাইকেলও ছিল। শুক্রবার ইফতারের পর সাহারোজ একাই মোটরসাইকেল নিয়ে একটু ঘুরতে বের হয়। পরিবারের কেউই তখন কল্পনাও করতে পারেননি যে সেটিই হবে তার জীবনের শেষ যাত্রা।
তিনি আরও বলেন, সাহারোজ ডেমরা এলাকা ও আশপাশের কয়েকটি সড়ক দিয়ে ঘুরে বাসায় ফিরছিল। কিন্তু নাগদারপাড় এলাকায় এসে মোটরসাইকেলটি হঠাৎ স্লিপ করে যায়। এতে সে রাস্তার ওপর পড়ে যায়। ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যান দ্রুতগতিতে এসে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত ছুটে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, খিলগাঁও থানা পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সাহারোজের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই তার অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সহপাঠীরা জানিয়েছেন, সাহারোজ ছিলেন শান্ত স্বভাবের, ভদ্র এবং সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারা একজন তরুণ। কলেজে তার বন্ধুমহলও ছিল বেশ বড়। তার মৃত্যুতে সহপাঠী ও শিক্ষকরাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সাহারোজ পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন এবং ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তার বাবা বিদেশে থাকলেও পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল তার মধ্যে। পরিবারের ছোট সদস্যদের প্রতিও ছিল তার আলাদা স্নেহ। এমন একজন তরুণের অকাল মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক ও শূন্যতা।
এই দুর্ঘটনা আবারও রাজধানীর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির যানবাহন এবং অসতর্ক মোটরসাইকেল চালনার কারণে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল চালানোর সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন হেলমেট ব্যবহার, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভারী যানবাহনের চালকদেরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে ট্রাফিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি অনেক সময় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা বা নিরাপত্তা সচেতনতার অভাবও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নাগদারপাড় এলাকার সড়কে প্রায়ই দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। তারা সড়কটিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাভার্ডভ্যানটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
একটি স্বাভাবিক সন্ধ্যায় ইফতারের পর একটু ঘুরতে বের হওয়া এক তরুণের জীবন এভাবে থেমে যাবে—এমনটা কেউই ভাবতে পারেনি। সাহারোজ আরেফিন গলিবের অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, তার বন্ধু, সহপাঠী এবং পরিচিত সবার জন্যই এক গভীর বেদনার গল্প হয়ে রইল।