প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। নীরবতা যেন ভারী হয়ে নেমে এসেছে বাগেরহাটের মোংলা শহরতলির শেহালাবুনিয়া এলাকার একটি বাড়ির উঠানে। কয়েক দিন আগেও যে উঠান বিয়ের আনন্দ, হাসি আর অতিথিদের কোলাহলে মুখর ছিল, সেই একই জায়গা হঠাৎই পরিণত হয়েছে শোকের নিস্তব্ধতায়। একে একে যখন পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছাতে থাকে, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। উঠানে সারি সারি খাটিয়া, আর চারপাশে কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজন—এই দৃশ্য যেন পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দেয়।
মোংলা-খুলনা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪ জন। তাদের মধ্যে একই পরিবারের ৯ জন সদস্য থাকায় শোকের গভীরতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শুক্রবার সকালে নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছালে শোকের মাতম ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—একটি পরিবারের স্বপ্ন, আনন্দ আর ভবিষ্যৎ এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ার করুণ গল্প। কয়েক দিন আগেও এই পরিবারটি ছিল বিয়ের আনন্দে ব্যস্ত। ছেলে বিয়ে করতে গিয়েছিল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। কিন্তু ফেরার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যায়।
নিহত গৃহকর্তা আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলায় হলেও দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটি মোংলায় বসবাস করে আসছিল। রাজ্জাক যুবক বয়সে মোংলায় এসে জাহাজে চাকরি এবং ব্যবসার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরিবারটিও ছিল সুখী ও স্বচ্ছল। মেয়ের বিয়েও আগেই কয়রায় দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ছেলের বিয়ের আয়োজনও সেখানেই করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের আনন্দ শেষ হওয়ার আগেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা পুরো পরিবারটিকে একসঙ্গে কেড়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি এমন দিন দেখতে হবে। কয়েক দিন আগে বাড়িতে ছিল বিয়ের আনন্দ, আর আজ সেখানে কেবল কান্না। রাজ্জাক ভাইয়ের পুরো পরিবারটাই প্রায় শেষ হয়ে গেল।”
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। হাজারো মানুষ সেই জানাজায় অংশ নেন। এরপর মোংলা পৌর কবরস্থানে পাশাপাশি নয়টি কবরে একই পরিবারের সদস্যদের দাফন করা হয়। এই দৃশ্য উপস্থিত মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অনেকেই অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ বিদায় জানান প্রিয়জনদের।
জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্তের আশ্বাস দেন।
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি বরের বড় ভাই আশরাফুল রহমান জনির। দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তানসহ পরিবারের মোট ৯ সদস্যকে। সেদিন পরিবারের অন্য সদস্যরা মাইক্রোবাসে উঠলেও তিনি মোটরসাইকেলে ছিলেন। তাই প্রাণে বেঁচে গেলেও চোখের সামনে প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখতে হয়েছে তাকে।
স্বজনদের ভাষায়, ঘটনার পর থেকে তিনি প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে শুধু একটি কথাই বলতে শোনা যায়—“আমার সব শেষ হয়ে গেছে।” এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার নিঃশব্দ কান্না এবং শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দৃশ্য উপস্থিত মানুষকে আরও বেশি কাঁদিয়ে তুলেছে।
মোংলা পৌর কবরস্থানের গোরখোদকদের জন্যও দিনটি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার একটি। সকাল থেকেই তারা একসঙ্গে নয়টি কবর খননের কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে সাতটি ছিল বড়দের জন্য এবং দুটি ছিল শিশুদের কবর।
গোরখোদক মুজিবর, বারেক ও রমজান জানান, তারা প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। কিন্তু একই পরিবারের নয়টি কবর এক দিনে খননের অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে প্রথম। কাজ করতে করতে তাদের চোখেও জল চলে আসে। তারা বলেন, “আমরা অনেক লাশ দেখেছি, অনেক কবর খুঁড়েছি। কিন্তু এক পরিবারের এতজনকে এক দিনে দাফন করার ঘটনা কখনো দেখিনি।”
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে। শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে তাদের মরদেহ সেখানে পৌঁছালে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়ির উঠানে তখন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আবার নিথর হয়ে বসে আছেন।
সেখানে দেখা যায়, নিহত দুই মেয়ের বাবা ও মা বারান্দায় চোখ বন্ধ করে পড়ে আছেন। তাদের পাশে বসে আছে ছোট্ট শিশু ইসমাইল। সে যেন কিছুই বুঝতে পারছে না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে চারপাশে তাকিয়ে আছে।
কনে মিতু আকতারের খালা জানান, তাঁর বোনের তিন সন্তান—মিতু, লামিয়া এবং ছোট ইসমাইল। বোনের সঙ্গে নতুন শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য ছোট্ট ইসমাইলও অনেক জেদ করেছিল। কিন্তু গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সে যেতে পারেনি। সেই কারণেই সে আজ বেঁচে গেছে।
এই দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকা শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনা আগে কখনো দেখেননি তারা। একদিকে বিয়ের আনন্দ, অন্যদিকে মুহূর্তেই মৃত্যু—এই বৈপরীত্য মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মেজবাহ উদ্দীনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
এদিকে নিহতদের পরিবার এবং স্বজনদের জন্য এই শোক সামাল দেওয়া সহজ নয়। যে বাড়িতে কয়েক দিন আগেও ছিল বিয়ের আনন্দ, সেই বাড়িতেই এখন শোকের মাতম। মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমে গেলেও কান্নার প্রতিধ্বনি যেন থেকে যাচ্ছে প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি উঠানে।
একটি দুর্ঘটনা শুধু ১৪টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং বহু পরিবারের স্বপ্ন, আশা আর ভবিষ্যৎকে মুহূর্তেই থামিয়ে দিয়েছে। সেই শোক এখন ছড়িয়ে পড়েছে শুধু একটি পরিবারে নয়, পুরো এলাকায়—যেখানে মানুষ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, এত বড় একটি পরিবার একসঙ্গে এভাবে হারিয়ে যেতে পারে।