পার্বতীপুরে ট্রেনের পাওয়ার কারে আগুন, আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৭ বার
পার্বতীপুর ট্রেনে আগুন ঘটনা

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনের পাওয়ার কারে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রোববার দিবাগত গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য পুরো জংশন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও আগুনে ট্রেনটির পাওয়ার কারের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুড়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের মিটারগেজ ওয়াশপিটে দাঁড়িয়ে থাকা রমনা কমিউটার ট্রেনটির কিছু যান্ত্রিক মেরামতের কাজ চলছিল। রোববার রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে ট্রেনটির পাওয়ার কারে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতের নিরিবিলি সময়ে হঠাৎ করেই পাওয়ার কারের দিক থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জেনারেটর ও পাওয়ার কারের ভেতরের বিভিন্ন অংশে দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রেনের মেরামতের সময় ওয়েল্ডিং বা ঝালাইয়ের কাজ করতে গিয়ে এই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেন লাইটিং রিপেয়ার বা টিএলআর কাজের সময় পাওয়ার কারে ঝালাই করা হচ্ছিল। ওই সময় ঝালাইয়ের আগুনের টুকরো নিচে পড়ে বগির ভেতরে থাকা তেলের সংস্পর্শে আসে। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই আগুন জ্বলে ওঠে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাওয়ার কারের ভেতরে থাকা যন্ত্রাংশে।

ঘটনার পরপরই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়রা দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। খবর পেয়ে পার্বতীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

পার্বতীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের লিডার মো. দুলাল গণমাধ্যমকে জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা প্রথম ও দ্বিতীয় কলের দুটি গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

তিনি আরও জানান, আগুন লাগার সময় ট্রেনটি ওয়াশপিটে অবস্থান করছিল এবং সেখানে মেরামতের কাজ চলছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

ঘটনার সময় রেলওয়ে জংশন এলাকায় রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে আগুন নেভানোর কাজে সহায়তা করেন এবং আশপাশের এলাকা নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় জংশনের আশপাশে অবস্থানরত কয়েকজন শ্রমিক ও কর্মচারী দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, আগুনের শিখা প্রথমে ছোট আকারে দেখা গেলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে তা বেশ বড় আকার ধারণ করে। পাওয়ার কারের ভেতরে থাকা তেল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ঘটনায় ট্রেনটির পাওয়ার কারের ভেতরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে জেনারেটর ইউনিট, বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

রমনা কমিউটার ট্রেনটি উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকাল ট্রেন হিসেবে পরিচিত। পার্বতীপুর থেকে রমনা বাজার পর্যন্ত চলাচলকারী এই ট্রেনটি প্রতিদিন বহু যাত্রীর যাতায়াতের মাধ্যম। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ যাত্রীরা এই ট্রেনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর বন্ধ থাকার পর এই ট্রেনটি আবারও চালু করা হয় ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর। পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকেই ট্রেনটি স্থানীয় যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।

সাম্প্রতিক এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ট্রেনটির ভবিষ্যৎ চলাচল নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ট্রেনটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়েল্ডিং বা ঝালাইয়ের মতো কাজ করার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে রেলওয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেরামতের সময় দাহ্য পদার্থ ও তেল নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করার বিষয়েও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন বহু ট্রেনের যাতায়াত হয় এবং বিভিন্ন ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজও পরিচালিত হয়। ফলে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগুন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারত এবং আশপাশে থাকা অন্যান্য বগি বা স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।

বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত