প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাবনায় দীর্ঘদিনের অবহেলায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়া খাল পুনরুদ্ধার এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাটি কেটে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল। সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে পাবনা জেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের পদ্মকোল খাল এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
এই খাল খনন কার্যক্রম স্থানীয় কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে অনেক খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষি সেচব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সরকার সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুরু হলো পাবনা থেকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তার ভাষায়, দেশের মানুষ অত্যন্ত সংকটময় সময়ে বর্তমান সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে, তাই জনগণের আস্থা রক্ষা করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, মসজিদ ও মন্দিরের ইমাম ও পুরোহিতদের জন্য সম্মানি ভাতা চালু করা এবং কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণ মওকুফের উদ্যোগ। তিনি বলেন, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে সমাজের সব স্তরের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ফারজানা শারমিন পুতুল আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে কৃষি ও কৃষক। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একসময় খালভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার ধারণা চালু করেছিলেন, যা দেশের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখন খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা খালগুলো পুনরুদ্ধার করা হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। তিনি জানান, সরকারের এই কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে মোট ৫৪টি খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হচ্ছে। এসব খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং কৃষকদের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, খালগুলোতে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হলে ভূ-উপরিস্থ পানির পরিমাণ বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। এর ফলে খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে এই উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় শ্রমিকদলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য মরে যাওয়া খাল-নালা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষকরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। তাই সারাদেশের মতো পাবনাতেও এই খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, এই খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কাজের গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
জেলা প্রশাসক ড. শাহেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজা হাবিব, পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, সদস্য সচিব এড. মাসুদ খন্দকার, পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার, পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার এবং সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাবনার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর এলাকা থেকে মন্ডলমোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি খনন করা হবে। খালটির গড় প্রস্থ প্রায় ৪০ ফুট এবং গভীরতা হবে প্রায় ৬ ফুট। এই খালটি পাবনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ইছামতী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খালটি সম্পূর্ণভাবে খনন করা হলে পদ্মা নদী থেকে ইছামতী নদীতে পানিপ্রবাহ আরও স্বাভাবিক হবে। এর ফলে আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সহজে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে হেমায়েতপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির আওতায় পাবনা জেলায় মোট ১০৬টি খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব খাল পুনঃখনন করা হলে জেলার কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জলাবদ্ধতার সমস্যাও অনেকাংশে কমে আসবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে কৃষিকাজের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ায় জলাবদ্ধতার সমস্যাও কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। খাল-নালা সচল থাকলে শুধু কৃষি নয়, স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ জীবিকা—সবকিছুর ওপরই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।