রাঙ্গামাটিতে গৃহহীনদের ঘর দিলো সেনাবাহিনী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার
রাঙ্গামাটিতে গৃহহীনদের ঘর দিলো সেনাবাহিনী

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে ঈদের আগে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন কিংবা জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করা বহু পরিবার এবার নতুন আশ্রয় পেয়েছে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে। সোমবার (১৬ মার্চ) সকালে জেলার জুরাছড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত নতুন ঘর আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই মানবিক কার্যক্রমের আওতায় মোট ২৫টি পরিবারের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে গেছে। এর মধ্যে ২০টি অসহায় পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরও ৫টি পরিবারের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘর সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। শুধু ঘরই নয়, প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, ফ্যান এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও সরবরাহ করা হয়েছে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রাঙ্গামাটি রিজিয়ন এবং জুরাছড়ি জোন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উপকারভোগী পরিবারের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন।

চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জুরাছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ হাসান সেজান, স্থানীয় হেডম্যান, কারবারী এবং এলাকার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাদের উপস্থিতিতে নতুন ঘর পাওয়া পরিবারগুলোর আনন্দ যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মানবিক কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড-এর তত্ত্বাবধানে এবং জুরাছড়ি জোনের উদ্যোগে। দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই প্রকল্পও তারই ধারাবাহিকতা।

নতুন ঘর পাওয়ার আনন্দ অনেক পরিবারের জন্য ছিল আবেগঘন মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে যাদের স্থায়ী আশ্রয় ছিল না, তাদের কাছে একটি নিরাপদ ঘর পাওয়া যেন নতুন জীবনের সূচনা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক পরিবার এখনো দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বসবাস করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দুর্বল ঘরে বসবাস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সেনাবাহিনী এই প্রকল্প হাতে নেয়। নতুন ঘরগুলো শুধু বসবাসের জন্য নয়, বরং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ, ফ্যান এবং আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে পরিবারগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে।

চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, অসহায় ও গৃহহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা রক্ষার কাজই করে না, বরং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করে থাকে।

তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে এই ঘরগুলোর নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যেসব পরিবার নতুন ঘর পেয়েছে, তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে নতুন ঘর পাওয়া পরিবারগুলোর অনেকেই তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাদের কথায় উঠে আসে দীর্ঘদিনের কষ্টের গল্প এবং নতুন আশার আলো।

ঘর পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা সাধন চাকমা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আগে তার কোনো স্থায়ী ঘর ছিল না। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাত জেগে বসে থাকতে হতো। অনেক সময় বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। এখন নতুন ঘর পাওয়ার ফলে তাদের সেই কষ্টের দিন শেষ হয়েছে বলে তিনি জানান।

আরেক উপকারভোগী ছালেহা আক্তার বলেন, এতদিন তিনি খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। তার নিজের কোনো ঘর ছিল না, ফলে নানা সমস্যার মধ্যে থাকতে হতো। সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু একটি ঘরই নয়, বরং আসবাবপত্র, বিদ্যুৎ সংযোগ, ফ্যান এবং প্রয়োজনীয় অনেক কিছু পেয়েছেন তিনি। এতে তার পরিবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

এই মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে শুধু ঘর নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি কার্যক্রম। স্থানীয় শতাধিক পরিবারের মাঝেও ঈদ উপলক্ষে উপহার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এতে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে ঈদের আনন্দে সামিল হতে পেরেছে অনেক অসহায় পরিবার।

স্থানীয়দের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে আস্থা ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও দৃঢ় করে। বিশেষ করে দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এমন সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন মানবিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে, তখন তা শুধু মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করে না, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনেরও পথ তৈরি করে। রাঙ্গামাটিতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ সেই ইতিবাচক উদাহরণগুলোর একটি।

ঈদের আগে গৃহহীন মানুষের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ শুধু একটি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নয়, বরং এটি মানবিক সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত