প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র রমজান মাসের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মের দুই পবিত্রতম স্থান মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী-তে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তারাবির নামাজে পবিত্র কোরআন খতম। এই উপলক্ষে লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে মুখর হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা।
ধর্মীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অনন্য সমন্বয়ে প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে এই কোরআন খতম অনুষ্ঠিত হয়। তারাবির নামাজের মাধ্যমে পুরো মাসজুড়ে কোরআন তেলাওয়াত শেষে শেষ রাতে এই খতম মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এক নিবেদিত সাধনার পরিণতি হিসেবেও বিবেচিত হয়।
সৌদি আরবের দুই পবিত্র মসজিদের ধর্মবিষয়ক পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, মক্কার মসজিদুল হারাম-এ তারাবির নামাজে ইমামতি করবেন প্রধান ইমাম ও খতিব ড. আবদুর রহমান আল-সুদাইস। অন্যদিকে মদিনার মসজিদে নববী-তে ইমামতি করবেন ড. সালেহ আল-বুদাইর।
বিশেষ করে ড. আবদুর রহমান আল-সুদাইস-এর নেতৃত্বে কোরআন খতমের এই আয়োজন দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। তিনি টানা কয়েক দশক ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যা মুসলিম বিশ্বের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৪ সাল থেকে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা এই বিশিষ্ট আলেমের কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা ছুটে আসেন।
রমজানের শেষ দশক মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত। তাই এই সময় ইবাদতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন।
এই বিশাল আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই পবিত্র মসজিদে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। মুসল্লিদের ইবাদতের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে, যাতে লাখো মানুষের সমাগম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়।
মসজিদের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভিন্ন ভাষায় নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসল্লিরা সহজেই নিয়মকানুন মেনে চলতে পারেন। বিশেষ করে কোরআন খতমের দিন মুসল্লিদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নামাজ চলাকালে কেউ মসজিদ থেকে বের হলে পুনরায় প্রবেশ করতে পারবেন না—এমন নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
প্রতি বছর এই কোরআন খতমকে কেন্দ্র করে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নামাজ শেষে দীর্ঘ মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দোয়া করা হয়। যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিরতায় ভরা বর্তমান বিশ্বে এই মোনাজাত মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসল্লিরা জানান, এই মুহূর্ত তাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। পবিত্র কাবাঘর সংলগ্ন মসজিদুল হারামে বা রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশের মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় এবং কোরআন খতমে অংশ নেওয়া তাদের কাছে এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের আয়োজন মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও দৃঢ় করে। এখানে জাতি, বর্ণ, ভাষা বা দেশের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন, যা ইসলামের সার্বজনীনতার একটি শক্তিশালী প্রতিফলন।
সামগ্রিকভাবে, মক্কা ও মদিনায় পবিত্র কোরআন খতম শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক সংযোগের এক বিশাল মিলনমেলা। এই আয়োজন বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ে নতুন করে ঈমানের জোয়ার সৃষ্টি করে এবং তাদের জীবনে ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্বকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।