প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ময়মনসিংহে আবারও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই রোগী শনাক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝেও। স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় একাধিক বৈঠক করেছে, পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতির উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র এখনো অনেকটাই চিন্তার জন্ম দিচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত বছর ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উদ্বেগজনক পর্যায়ে। ২০২৫ সালে জেলায় মোট তিন হাজার ২১৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২৪৪ জন, আর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই হাজার ৯৭৫ জন রোগী। মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ছিল ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, যা বয়সভিত্তিক ঝুঁকির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে নান্দাইল উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল।
চলতি বছর পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক পথে এগোচ্ছে না, তারও ইঙ্গিত মিলছে। ১৩ মার্চ পর্যন্ত জেলায় ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম মনে হতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুম শুরুর আগেই এ ধরনের প্রবণতা ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকির পূর্বাভাস বহন করে। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সাতজন এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর ধীরে ধীরে চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহির উদ্দীন ডেঙ্গু বিস্তারের মূল কারণ হিসেবে মানুষের অসচেতনতা এবং আশপাশে জমে থাকা পানিকে দায়ী করেছেন। তার মতে, বাসাবাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা ছোট ছোট পাত্র, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক, আইসক্রিমের প্যাকেট, কিংবা নর্দমায় জমে থাকা সামান্য পানি—এসবই এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে। শহরের নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি এবং ফুলের টব কিংবা পুরোনো টায়ারের ভেতরে জমে থাকা পানিও বড় ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠছে।
তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু মশার ডিম দীর্ঘ সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। প্রায় ৮ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত জীবিত থাকা এই ডিমগুলো বৃষ্টি হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মশার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা সংক্রমণের হারও বাড়িয়ে দেয়।
ফগিং কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নির্দিষ্ট সময় মেনে ফগিং করতে হয়। সাধারণত সকাল ৭টার আগে এবং বিকাল ৫টার পর এই কার্যক্রম সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সময়সূচি অনুসরণ করা হয় না। পাশাপাশি ব্যবহৃত ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ না করায় ফগিংয়ের ফলও প্রত্যাশিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. কাজী শাহানারা আহমেদ মনে করেন, শুধু ফগিং করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করলে উল্টো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, অদক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে স্প্রে করা হলে অনেক মশা বেঁচে যায় এবং ধীরে ধীরে কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এতে ভবিষ্যতে একই ওষুধ ব্যবহার করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, দেশে ব্যবহৃত লার্ভিসাইড বিটিআই পরিবেশবান্ধব হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তব প্রয়োগে এর কার্যকারিতা সব জায়গায় সমানভাবে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ মশার শরীরে গঠনগত পরিবর্তন ঘটলে কীটনাশক আর কার্যকর থাকে না।
নগরবাসীর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার দৃশ্যমান হলেও সিটি করপোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক বাসিন্দা জানান, নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম বা লার্ভা ধ্বংসের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে সন্ধ্যা নামলেই মশার উপদ্রব অসহনীয় হয়ে উঠছে।
রামবাবু রোড এলাকার বাসিন্দা জহির উদ্দিনের কথায় ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। তিনি জানান, দিন-রাত মশার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না, আর ঘরে বসে কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই সারাক্ষণ কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করছেন, যা আবার নতুন করে শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি করছে।
এছাড়া কীটনাশক সরবরাহে সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ওষুধে প্রয়োজনীয় উপাদান কম ব্যবহার করা হয়, ফলে তা কার্যকর হয় না। এতে শুধু অর্থের অপচয়ই নয়, বরং মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দীর্ঘমেয়াদে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বৃদ্ধির ফলে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত বাড়ছে। আগে যেখানে ডেঙ্গুর মৌসুম সীমাবদ্ধ ছিল বর্ষাকালে, এখন সেখানে প্রি-মনসুন সময়েও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্মাণাধীন স্থানে জমে থাকা পানি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসন প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম জানিয়েছেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগাম প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে দ্রুত পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হবে বলে তিনি জানান।
জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। নিয়মিত ফগিং কার্যক্রমের পাশাপাশি নালা-নর্দমা পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ এবং লার্ভিসাইড প্রয়োগ আরও জোরদার করা হবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে জোরালো মশা নিধন অভিযান, সম্ভাব্য সব জায়গা থেকে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় ময়মনসিংহে আবারও ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর।