প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) দিল্লিতে নিয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগরের আদালতের অনুমতির ভিত্তিতে সোমবার রাতে তাঁদের ট্রানজিট রিমান্ডে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তদন্ত নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে এবং ঘটনাটির পেছনের পরিকল্পনা ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য উদঘাটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ ফয়সাল ও আলমগীরকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায়। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করলে তাঁদের দিল্লিতে নেওয়া হয়। সেখানে এনআইএর বিশেষ আদালতে তাঁদের হাজির করা হবে এবং আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং পেছনের সংগঠনের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এর আগে, গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বনগাঁ এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে ২২ মার্চ তাঁদের আদালতে তোলা হলে বিচারক ১২ দিনের জন্য কারা হেফাজতের নির্দেশ দেন। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই এনআইএ তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করে এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে নিয়ে যায়।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই দুই আসামিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই মামলায় একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক জড়িত থাকতে পারে, যার বিভিন্ন স্তর এখন তদন্তের আওতায় আসছে।
আদালতে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে ফয়সাল করিম মাসুদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। তাঁর এই বক্তব্য তদন্তের গতিপ্রকৃতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করলেও, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি হিসেবে বিবেচনা করছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি নিহত হন। ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তদন্তের এক পর্যায়ে উঠে আসে, মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় এবং সেই মোটরসাইকেলে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে ফয়সালের নাম তদন্তে সামনে আসে, যা ঘটনাটিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে এগোচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এনআইএর হাতে আসামিদের তুলে দেওয়ার ফলে তদন্ত আরও পেশাদার ও গভীরতর হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধের মূল উৎস শনাক্ত করা সহজ হবে।
বর্তমানে নজর রয়েছে দিল্লিতে এনআইএর বিশেষ আদালতে তাঁদের উপস্থাপন ও পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের দিকে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে, যা পুরো মামলার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ বিরাজ করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হাদি হত্যা মামলার তদন্ত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আসামিদের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তদন্তের পরিসর আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। এখন প্রশ্ন—এই জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে কত দ্রুত এবং কতটা নির্ভুলভাবে এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়।