কবরস্থান জমি নিয়ে সংঘর্ষে কলেজছাত্র নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৮ বার
টাঙ্গাইল কবরস্থান সংঘর্ষ নিহত

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে কবরস্থানের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের ভয়াবহ সংঘর্ষে নাইম হোসেন (১৮) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রামদেবপুর গ্রামে। নিহত নাইম একই গ্রামের ওসমান আলীর ছেলে এবং হাতিয়া কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষের সময় গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যায়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রামদেবপুর কবরস্থানের জমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। একপক্ষ ‘সওদাগর গ্রুপ’ এবং অন্যপক্ষ ‘মন্ডল ও সিকদার গ্রুপ’ নামে পরিচিত। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিকবার উত্তেজনা, ঝগড়া ও হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য মর্জিনা বেগম।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি মীমাংসার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এমনকি সামাজিক ঐক্য বজায় রাখতে গত ঈদেও দুই পক্ষ আলাদাভাবে ঈদের নামাজ আদায় করে, যা এলাকায় বিভাজনের চিত্র আরও স্পষ্ট করে তোলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার জের ধরে বুধবার সকাল থেকে এলাকায় আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুপুরের দিকে দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

সংঘর্ষে লাঠি, রড ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহৃত হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় নাইম হোসেনসহ অন্তত ছয়জন আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাইমকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত নাইম সওদাগর গ্রুপের সমর্থক ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তবে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মানুষই আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহল জোরদার করেছে। স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষের পর থেকে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তার কারণে ঘর থেকে বের হচ্ছে না।

এ বিষয়ে কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌফিক আজম জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।

তিনি আরও জানান, নিহতের মরদেহ টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কবরস্থানের মতো সংবেদনশীল জায়গার জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন ছিল। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

এদিকে, এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত নাইমের সহপাঠী ও বন্ধুরা তার অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পরিবারে চলছে আহাজারি। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জমি ও স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিরোধ সময়মতো সমাধান না হওয়ায় তা সংঘর্ষে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা।

তারা আরও বলছেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি ও সামাজিক উভয় প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা জরুরি।

সব মিলিয়ে টাঙ্গাইলের এই ঘটনা আবারও গ্রামীণ বিরোধের ভয়াবহ রূপ সামনে এনেছে, যেখানে একটি তরুণ প্রাণের অকাল মৃত্যু পুরো এলাকায় শোক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত