প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দেশের ১৮তম নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এমন একটি বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চান, যেখানে কোনো নাগরিক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। দ্রুত ও কার্যকর বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় তিনি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৫ মার্চ) নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। তার মতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, দেশের সংবিধান নাগরিকদের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি মনে করেন, বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে আইনি প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন।
গত ২৭ ডিসেম্বর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তার পদত্যাগের পর থেকেই দেশের আইন অঙ্গনে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন মহলে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর নাম আলোচনায় আসে। অবশেষে সরকার সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করা তার অন্যতম অগ্রাধিকার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন আইনজীবী ও বিশ্লেষকরা। তিনি তিনবার আইনজীবী সমিতির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইন পেশায় তার অভিজ্ঞতা তিন দশকের কাছাকাছি।
১৯৯৫ সালে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে তার পেশাজীবনের সূচনা হয়। শুরু থেকেই তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনার মাধ্যমে আইন অঙ্গনে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। আইন পেশার পাশাপাশি ছাত্রজীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি, যা তাকে সমাজের নানা বাস্তবতা ও মানুষের সমস্যা সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে বলে মনে করা হয়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কূটনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিচারব্যবস্থায় বিদ্যমান মামলার জট, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সেই দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন যেখানে বিচারব্যবস্থা কার্যকর, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ। ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ানো অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেছেন, বিচারব্যবস্থা শুধু আইনগত বিষয় নয়, এটি মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই বিচারপ্রার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
আইন অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইন শুনানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করা সম্ভব।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে আইনি অবস্থান তুলে ধরা, সংবিধান রক্ষা করা এবং আইনগত পরামর্শ প্রদান করা তার প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে এই পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিচারব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের নিয়োগের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকবেন বলে জানিয়েছেন। তার মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে সমাজে ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধ আরও সুদৃঢ় হবে।
সব মিলিয়ে, দেশের বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি বিচারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন বলেই প্রত্যাশা সবার।