প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে আবারও সড়ক দুর্ঘটনার করুণ চিত্র সামনে এসেছে। পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক তরুণ প্রকৌশলী এবং কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মকর্তা। এই দুই মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় জনমনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে, পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে রাজস্থলী উপজেলার রাইখালী–বাঙ্গালহালিয়া সড়কে। বুধবার রাত আনুমানিক ১০টা ৪০ মিনিটে বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের সেলমারা এলাকায় একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মোটরসাইকেল চালক উক্যসিং মারমা, যিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী মতি পাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার সময় সড়কটি ছিল নির্জন এবং আলো স্বল্প। হঠাৎ করেই মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। তবে আঘাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান।
চন্দ্রঘোনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকের আহমেদ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতি এবং চালকের অসতর্কতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দায়িত্ব পালনকালে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান কাপ্তাই পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক মো. মাহাবুর হাসান। গত ২৩ মার্চ একটি সিএনজি অটোরিকশায় যাতায়াতের সময় মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্প গেট সংলগ্ন এলাকায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাঙামাটি জেলা পুলিশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মীরা তাকে একজন দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে স্মরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রেখে গেছেন। তার পরিবার এখন শোকের ভারে ন্যুব্জ, আর সহকর্মীরা হারিয়েছেন একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। সরু ও আঁকাবাঁকা রাস্তা, অপর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং অনেক সময় চালকদের অসতর্কতা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন। একই সঙ্গে চালকদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
এই দুটি দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, সড়ক নিরাপত্তা শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং জীবন রক্ষার অপরিহার্য উপাদান। একজন প্রকৌশলী, যিনি উন্নয়নের অংশীদার ছিলেন, এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি জনগণের নিরাপত্তায় কাজ করছিলেন—তাদের অকাল মৃত্যু সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
রাঙামাটির সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসন এই দুই ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই শোকাবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে থাকে একটি পরিবারের কান্না, স্বপ্নভঙ্গের গল্প এবং এক অনির্বচনীয় শূন্যতা। তাই সড়কে সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই হতে পারে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের একমাত্র উপায়।