প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজট যেন এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে হাজারো যাত্রী ও চালকের সামনে। মহান স্বাধীনতা দিবসের ছুটির দিনে স্বস্তির যাত্রা আশা করলেও বাস্তবে তাদের অনেকেই পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। সকাল থেকে শুরু হওয়া যানজট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন আকার ধারণ করে যে, এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পেরিয়ে গজারিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই যানজটের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে লাঙ্গলবন্দে অনুষ্ঠিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অষ্টমী স্নান উৎসব। প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী সমবেত হন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে উৎসবের প্রথম দিন পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে মহাসড়কের স্বাভাবিক গতি ভেঙে পড়ে।
সড়কে আটকে পড়া যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল ক্লান্তি, বিরক্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ। কেউ কেউ বাসের ভেতরে বসে দীর্ঘ অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে পড়েন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে নেমে হাঁটতে শুরু করেন। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা জরুরি প্রয়োজনে ঢাকামুখী যাত্রা করছিলেন, কিন্তু যানজট তাদের পরিকল্পনাকে ভেঙে দিয়েছে।
ঢাকাগামী একটি বাসের চালক বিল্লাল হোসেন জানান, স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিতে পাঁচ মিনিট লাগে, সেখানে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কুমিল্লা থেকে ছেড়ে আসা আরেক চালক লিয়াকত। তিনি বলেন, ১০ মিনিটের রাস্তা পার হতে তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে, ফলে কখন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মহাসড়কের এই দীর্ঘ যানজট শুধু যাত্রীদের জন্যই নয়, চালকদের জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর হঠাৎ থেমে থাকা, আবার ধীরে ধীরে এগোনো—এই প্রক্রিয়া শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক চালক জানান, দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে আটকে থাকার কারণে জ্বালানি খরচও বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এদিকে যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন গজারিয়া ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহ কামাল আকন্দ। তিনি জানান, লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসবকে ঘিরে মধ্যরাত থেকেই ঢাকামুখী লেনে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যরা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং একমুখী চলাচলের কারণে দ্রুত যানজট নিরসন সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর এই উৎসবের সময় মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হলেও এ বছর তা কিছুটা বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প পথের ব্যবস্থা না থাকায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যানজটের প্রভাব শুধু যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পণ্যবাহী যানবাহনও আটকে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। এতে করে ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন পণ্য বহনকারী যানবাহনের চালকরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের বড় ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জরুরি। মহাসড়কের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন হয়ে যাত্রার সময় নির্বাচন করা প্রয়োজন।
দিনের শেষে যানজট ধীরে ধীরে কমে এলেও অনেক যাত্রীর জন্য এই দিনটি হয়ে উঠেছে ভোগান্তির প্রতীক। স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ যেখানে স্বস্তি এনে দেওয়ার কথা, সেখানে দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে অনেকে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তবে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। লাঙ্গলবন্দের মতো বড় ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে মানুষের অংশগ্রহণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এই ভারসাম্য রক্ষা করেই আগামী দিনে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।