প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু স্থানীয় জনপদে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুরের দিকে উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের খড়িবাড়িয়া গ্রামের দক্ষিণ মাঠে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন সমির বিশ্বাস (৪০) ও অপু বিশ্বাস (২২)। একই ঘটনায় আরও চারজন কৃষক আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে খড়িবাড়িয়া গ্রামের দক্ষিণ মাঠে কয়েকজন কৃষক একসঙ্গে কাজ করছিলেন। সমির বিশ্বাস তার বাবার সঙ্গে জমি থেকে পেঁয়াজ তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পাশের জমিতে অপু বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন শ্রমিক কৃষিকাজ করছিলেন। আকাশ তখন মেঘলা ছিল, তবে কেউই বুঝতে পারেননি যে মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। হঠাৎ করে বিকট শব্দে বজ্রপাত হলে মাঠে থাকা কয়েকজন কৃষক গুরুতর আহত হন। বজ্রপাতের তীব্রতায় তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যরা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েন।
গ্রামবাসীরা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে শৈলকূপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক গুরুতর আহত সমির বিশ্বাস ও অপু বিশ্বাসকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্যদের মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বজ্রপাতের আঘাত অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় ঘটনাস্থলেই তাদের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
শৈলকূপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এহেতাম শহীদ জানান, আহতদের দুপুর সোয়া ১২টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুতর। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পরও দুইজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। অন্য আহতদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তাদের অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।
এই ঘটনায় খড়িবাড়িয়া গ্রামে শোকের মাতম নেমে এসেছে। নিহত সমির বিশ্বাস ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অপরদিকে অপু বিশ্বাস ছিলেন তরুণ কৃষিশ্রমিক, যিনি পরিবারের ভবিষ্যতের আশা হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। দুই পরিবারের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। প্রতিবেশীরা জানান, সমির বিশ্বাস ছিলেন পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। আর অপু বিশ্বাস ছিলেন উদ্যমী তরুণ, যিনি সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে শুরু করেছিলেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায়ই কৃষকেরা প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করার সময় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষকরা জীবিকার তাগিদে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে হঠাৎ বজ্রপাতের মতো দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময় বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। এই সময় কৃষকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে বা বজ্রধ্বনি শোনা গেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বজ্রপাত একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যার বেশিরভাগই কৃষক বা খোলা জায়গায় কর্মরত মানুষ। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখা এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকলে মাঠে কাজ বন্ধ রাখা উচিত।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে, আর গ্রাম হারিয়েছে দুই পরিশ্রমী মানুষকে। স্বজনদের কান্না ও শোক যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে মানুষ কতটা অসহায়।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করলে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ভবিষ্যতে আকাশে মেঘ দেখলেই তারা মাঠ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাবেন।
ঝিনাইদহের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও সচেতনতা বৃদ্ধি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে যারা দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।