প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে নিহত র্যাব সদস্য ডিএডি আব্দুল মোতালেব হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ২০ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে Rapid Action Battalion-৭ চট্টগ্রাম ১৩ জনকে এবং জেলা পুলিশ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং পলাতক অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২৭ মার্চ নোয়াখালীর কবিরহাট এলাকা থেকে পারভেজ, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে বেলাল এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানার শেরশাহ এলাকা থেকে সাইদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২৩ মার্চ সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট এলাকা থেকে মিজানুর রহমান সোহানকে আটক করা হয়। একই মামলায় ১৫ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কাট্টালী এলাকা থেকে সেলিম এবং ১০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকা থেকে সেকেন্দার মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইউনুছ আলী হাওলাদার, খন্দকার জাহিদ হোসেন, আলীরাজ হাসান, মিজান, মামুন, শহাজাহান ও শফিকুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই আসামিদের শনাক্ত করে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে করে ধীরে ধীরে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক এআরএম মোজাফ্ফর হোসেন জানিয়েছেন, মামলার এজাহারভুক্ত ও তদন্তে প্রাপ্ত আসামিদের গ্রেফতারে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং পলাতক অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার মতো ঘটনায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে র্যাব সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে জানা গেছে। হামলায় চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। আহতদের দ্রুত চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডিএডি আব্দুল মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য আহত সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান শুরু করে। অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্ত করতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনায় Rapid Action Battalion-৭ বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, সন্ত্রাসী হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার মতো ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধী চক্রগুলো অনেক সময় এই ধরনের এলাকায় আশ্রয় নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
নিহত ডিএডি আব্দুল মোতালেবের মৃত্যু সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে র্যাবে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। সহকর্মীরা তাকে সাহসী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মৃত্যুতে পরিবারও গভীর শোকাহত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, সহকর্মীর এই আত্মত্যাগ তাদের দায়িত্ব পালনে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তারা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার প্রবণতা কমবে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ালে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
এই ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পলাতক অন্য আসামিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জঙ্গল সলিমপুরের এই হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া র্যাব সদস্যের আত্মত্যাগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরাধ দমনে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকলে এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।