প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাঙ্গামাটিতে জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দুই দিন বিরতির পর শনিবার শহরের মেসার্স মহসিন ফিলিং স্টেশনে সীমিত পরিসরে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হলে সেখানে দেখা যায় দীর্ঘ অপেক্ষার এক মানবিক চিত্র। সকাল থেকেই মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে অকটেন সংগ্রহের জন্য প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় পরিবহন খাতের পাশাপাশি কৃষি কাজেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক কৃষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে খাদ্য সরবরাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শনিবার সকাল থেকেই ফিলিং স্টেশন এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। মোটরসাইকেল চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন। অনেকেই জানান, প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কেউ কেউ বলেন, জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা হলেও জ্বালানি সংকট তাদের অসহায় করে তুলেছে।
মেসার্স মহসিন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. আব্দুল বাতেন জানান, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ আগের তুলনায় কম আসছে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় খুবই কম। আগে ৪ হাজার লিটার অকটেন শেষ হতে চার দিন সময় লাগত, কিন্তু এখন সেই একই পরিমাণ জ্বালানি মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, জ্বালানির চাহিদা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি।
জ্বালানি সংগ্রহের সময় যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য ফিলিং স্টেশনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের মোবাইল টিমও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কাজ করছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত শারমিন বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রতিটি পাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কোথাও কেউ যাতে জ্বালানি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে মোবাইল টিম দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
জ্বালানি সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মোটরসাইকেল চালক, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষকরা। অনেকে জানিয়েছেন, জ্বালানি না থাকায় তারা সময়মতো কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। আবার কৃষি জমিতে সেচ দিতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য—সবখানেই জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, জ্বালানি সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং তারা স্বাভাবিকভাবে তাদের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
রাঙ্গামাটির এই পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এমন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।