শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে লালমনিরহাটে ব্যাপক ফসল ও ঘরবাড়ি ক্ষতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
  • ১০ বার
শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে লালমনিরহাটে ব্যাপক ফসল ও ঘরবাড়ি ক্ষতি

প্রকাশ: ২৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার উপর দিয়ে রাতে বয়ে যাওয়া আকস্মিক ঝড় ও প্রলয়ংকরী শিলাবৃষ্টি এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মাত্র ১০ মিনিটের এই তাণ্ডবে অসংখ্য ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, উপড়ে পড়েছে গাছপালা এবং বিদ্যুতের খুঁটি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ এবং কৃষকরা, যাদের মাঠের ফসল এখন ধ্বংসের পথে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে রাত কাটিয়েছেন, ভয়ে ঘরে থাকতে পারছেন না।

ঝড় ও শিলাবৃষ্টির প্রভাবে জেলার সদর, আদিতমারী, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও পাটগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চরম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রচণ্ড তীব্রতা এমন ছিল যে মুহূর্তের মধ্যেই অনেকের টিনের ঘরের চালা ফুটো হয়ে যায়। কিছু স্থানে বড় বড় গাছ ভেঙে বসতঘরের ওপর পড়ে গেলে বাসিন্দারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি। এলাকাবাসীর মতে, এত বড় ধ্বংসপ্রাপ্তি তারা আগে কখনো দেখেননি।

কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, রাতের শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের তীব্রতায় তিনি এবং তার পরিবার বাচ্চাদের নিয়ে সারারাত বসে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, “রাতে যে পরিমাণ শিলা পড়েছে, ভয়ে ঘরে থাকতে পারিনি। আজও আকাশ মেঘলা, গতকালের মতো শিলাবৃষ্টি হলে ঘরটাই ভেঙে যাবে। আমরা গরিব মানুষ, দিনে এনে দিনে খাই। ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে নতুন করে কীভাবে তৈরি করব?”

কৃষকরা ক্ষতির সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন। তাদের মাঠের ফসল প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। আদিতমারী উপজেলার কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমি চার দোন জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলাম। রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষেতের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তামাক পাতাগুলোও ভিজে গেছে। ভেবেছিলাম বিক্রি করে ঘরের টিন ঠিক করব, কিন্তু সব নষ্ট হয়ে গেল। আমরা গরিব, এখন আর কোনো উপায় নেই।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। লালমনিরহাট কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহান জানান, গতকালের রাতের শিলাবৃষ্টির কারণে উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ভোটমারী ইউনিয়নের দুটি এবং তুষভাণ্ডার ইউনিয়নের তিনটি এলাকা পরিদর্শন করেছি। এরপর কাকিনা ইউনিয়নে যাব। ঈদের একদিন আগে হওয়া বৃষ্টির চেয়ে এবার ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। ভোটমারী এলাকায় প্রায় ১০০টি টিনের ঘর বসবাসের উপযোগী নয়। ভুট্টারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে। তালিকা সম্পূর্ণ হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ আর্থিক ও ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা হবে।

এদিকে, স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাতের ঝড়ের কারণে বিদ্যুতের খুঁটিসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের জন্য কাজ করা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। এছাড়া বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পুনরায় এমন ঝড় বা শিলাবৃষ্টি হলে ঘরবাড়ি ও ফসল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশাসন ইতোমধ্যেই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য খাদ্য, পানি ও শরণস্থল নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিরা আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন।

এ পরিস্থিতি স্থানীয়দের জন্য এক মারাত্মক শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবেলায় আরও প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন সরকারের সহায়তা ও পুনর্বাসনের উপর নির্ভর করছেন। তাদের মতে, সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া দুর্যোগের পরিপূর্ণ ক্ষতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

এই ঘটনায় প্রশাসন জানিয়েছে, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে লোকসান ও ফসল ক্ষতির পরিমাণ পুরোপুরি নিরূপণ করার কাজ চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ত্রাণ, আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো হবে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার জন্য স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় কমিটি সক্রিয় রয়েছে।

প্রকৃতি যে কখনোই নিঃশব্দ থাকে না, তার প্রমাণ এই রাতের শিলাবৃষ্টি। লালমনিরহাটের মানুষ এখন ক্ষতির পরিমাণ মেপে দেখতে, আর সরকারের সহায়তা প্রত্যাশা করছে যাতে তাদের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত