ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে নতুন অভিযোগ, তদন্তে ডিবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে নতুন অভিযোগ, তদন্তে ডিবি

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০০৭ সালের বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন বা ১/১১ পর্বকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সাম্প্রতিক গ্রেফতার ও অভিযোগের ঘটনা। সেই সময়ের আলোচিত দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) Masud Uddin Chowdhury এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) Sheikh Mamun Khaled-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই সময় গ্রেফতার, নির্যাতন, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত ছিলেন। এদিকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা Detective Branch (DB) জানিয়েছে, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রেক্ষাপট তৈরিতে এই দুই কর্মকর্তার পাশাপাশি আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি কয়েক দিনের ব্যবধানে পৃথক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্যদিকে শেখ মামুন খালেদকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই দুই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা সাধারণভাবে ওয়ান-ইলেভেন নামে পরিচিত।

ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি Iajuddin Ahmed জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে আসছে নতুন কিছু অভিযোগ, যা সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে যে ওয়ান-ইলেভেন ঘোষণার আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন কয়েকজন প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তা যাচাই করতে কাজ করছে তদন্ত সংস্থা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান Mohammad Shafiqul Islam জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগী ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ জমা দিতে বলা হয়েছে, যাতে বিষয়গুলো আইনগত কাঠামোর মধ্যে তদন্ত করা যায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওয়ান-ইলেভেন সময়কালে অনেককে বিনা অভিযোগে আটক রাখা হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়, তবুও তদন্তকারীরা বলছেন, প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ান-ইলেভেন সময়কার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেশকে একটি জটিল অবস্থার মধ্যে নিয়ে যায়। জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।

তবে সেই সময়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, দীর্ঘ সময় আটক রাখা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি থামেনি। সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো আবারও সেই বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতীতের যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, তদন্তের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর হলেও যদি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এসব বিষয় সামনে আনা হতে পারে। তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ওয়ান-ইলেভেন পর্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক অভিযোগ ও তদন্তের অগ্রগতি ভবিষ্যতে এই অধ্যায় সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত