প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথচলার পর নতুন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এবার দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বাছাই। এই আসনগুলোকে ঘিরে দলটির ভেতরে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু সাংগঠনিক চাপই নয়, বরং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিন্যাসের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিএনপির এই সংরক্ষিত নারী আসন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত কয়েকশ নেত্রী মনোনয়নের আশায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থী আগ্রহ প্রকাশ করায় দলটির জন্য সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা এখন এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের এই প্রতিযোগিতা শুধু সংখ্যার দিক থেকেই বড় নয়, এর ভেতরে রয়েছে নানা স্তরের রাজনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা নেত্রী, মহিলা দল ও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা কর্মীরা যেমন এগিয়ে আছেন, তেমনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত নারীরাও আলোচনায় রয়েছেন। ফলে এই প্রতিযোগিতা একদিকে যেমন বৈচিত্র্যময়, অন্যদিকে তেমনি জটিলও।
এদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ। সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল বৈঠকের পর ৭ থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। এই সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা আরও বেড়ে গেছে।
সংসদের মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে প্রায় ৩৫টি আসন বিএনপি জোটের দখলে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এই সংখ্যাটি বিএনপির জন্য যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি দলীয় ভেতরে প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কারণ এই আসনগুলোই হতে পারে নতুন নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম ক্ষেত্র।
দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জানা গেছে, এবারের মনোনয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদান এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের বিষয়গুলোকে। ২০০৮ সালের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ত্রয়োদশ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদেরও অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় মানবিক দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত বা গুরুতর আহত নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দলটি একদিকে যেমন ত্যাগের স্বীকৃতি দিতে চায়, অন্যদিকে সাংগঠনিক সংহতিও বজায় রাখতে চায়।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। দলীয় কার্যালয়, শীর্ষ নেতাদের বাসভবন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন তারা। নিজেদের যোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের প্রতি অবদানের বিষয় তুলে ধরে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে জোরেশোরে। অনেকেই ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি সংগঠনের ভেতরেও সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।
আলোচনায় থাকা প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্যরা, যারা অতীতে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলের হয়ে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে হাসিনা আহমদ ও রুমানা আহমেদের মতো নেত্রীরা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা শুধু নির্বাচনে অংশই নেননি, বরং আন্দোলন-সংগ্রামেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
এছাড়া নিলোফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা এবং রেহানা আক্তার রানুর মতো অভিজ্ঞ নেত্রীরাও আলোচনায় রয়েছেন। তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দলীয় সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতাদের পরিবার থেকেও একাধিক প্রার্থী আলোচনায় উঠে এসেছেন। সাবিনা ইয়াসমিন, তাহমিনা জামান শ্রাবণী, শামীম আরা বেগম, রিপা ওয়ালী খানসহ আরও অনেকে এই তালিকায় রয়েছেন। রাজনৈতিক পরিবারের অংশ হওয়ায় তারা যেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তেমনি দলীয় সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকতে পারেন।
তৃণমূল পর্যায় থেকেও উঠে আসা নেত্রীদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু এবং অধ্যাপিকা নাজমা সুলতানা ঝংকার। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন, যা তাদের প্রার্থিতাকে শক্তিশালী করেছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীদের মধ্য থেকেও কয়েকজন সংরক্ষিত আসনের জন্য এগিয়ে রয়েছেন। সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা এবং সানজিদা ইসলাম তুলির মতো নেত্রীরা তাদের সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা এবং জেবা আমিন খানের মতো পরিচিত মুখও বিবেচনায় রয়েছেন।
দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে একটি বড় তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে ধাপে ধাপে সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পরই দলীয় ফোরামে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে বিএনপির এই প্রতিযোগিতা একদিকে যেমন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে এটি একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জও। সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করতে পারলে এটি দলকে আরও শক্তিশালী করবে, আর ভুল সিদ্ধান্ত দলীয় ঐক্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক গতিশীলতা তৈরি করেছে। এখন সবার নজর দলটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে—কাদের হাতে যাচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলো, আর তার মাধ্যমে কীভাবে গড়ে উঠছে আগামী দিনের নারী নেতৃত্ব।