প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক অবস্থান। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রণালিটি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রস্তুত তারা।
এই অবস্থান বাস্তবায়িত হলে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, কারণ এর মাধ্যমে আমিরাত সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো আমূল পরিবর্তিত হতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর গভীর প্রভাব পড়বে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করছে আমিরাত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অচলাবস্থা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে আমিরাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ-এ একটি প্রস্তাব উত্থাপনের চেষ্টা চলছে, যা হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার সামরিক শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ জোট গঠনের আহ্বানও জানানো হয়েছে।
একজন আমিরাতি কর্মকর্তা বলেছেন, “ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে এবং তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিকেও তারা সঙ্গে নিয়ে সংকটে ফেলতে প্রস্তুত।” এই মন্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আমিরাত ইরানের পদক্ষেপকে শুধু আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
উল্লেখযোগ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনার পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই দাবিগুলোর সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এ ধরনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য অস্বীকার না করে বরং একটি কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে। এই বক্তব্যকে অনেকেই একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এই প্রণালিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সবসময় এই পথকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই এখন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আমিরাতের সরাসরি সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা।
এই সম্ভাব্য সংঘাতের মানবিক দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হলে তা লাখো মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা নিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেক দেশই এখনো কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে এবং সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আগে সব ধরনের আলোচনার পথ খোলা রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং যেকোনো সময় এটি আরও জটিল রূপ নিতে পারে।
আমিরাতের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এতদিন যেখানে তারা মূলত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে, সেখানে এবার সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিকেই নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণকেও নতুন করে সাজাতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমিরাতের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা এই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে, আবার আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে সমাধানের পথও তৈরি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কূটনীতি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, নাকি পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতের দিকেই গড়ায়।