প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে—এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে। একাধিক আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংকের মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও কৌশলগত দিক থেকে এই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি পশ্চিমা জোট।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০টি থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এই গবেষণা পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যারা গত এক মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কিছু ‘ট্যাকটিক্যাল’ সাফল্য অর্জন করলেও তাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়নি। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কিংবা দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার মতো বড় লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি। ফলে যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য হতাশাজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান অত্যন্ত পরিকল্পিত ও কৌশলী উপায়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। ‘অসামান্য ও বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধকৌশল’ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশটি প্রতিপক্ষের চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি-এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরানের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান সত্ত্বেও তারা এই প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে বিভিন্ন দেশে। এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, তা হলো যুদ্ধের ধরন পরিবর্তন। শুরুতে দ্রুত ফলাফল পাওয়ার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ‘ক্ষয়যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। এই ধরনের যুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা প্রধান কৌশল। বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘসূত্রতা ইরানের পক্ষেই কাজ করছে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে সীমিত বিকল্প রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একদিকে তারা ‘প্রচারমূলক বিজয়’ দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে পারে, অন্যদিকে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছাড়াই সংঘাতের ইতি টানতে বাধ্য হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই তাদের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই গবেষণায় বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকটি থিংক ট্যাংকের প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট, ছাথাম হাউস, র্যান্ড করপোরেশন এবং কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেসনস-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। এসব সংস্থার বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিবেচিত হয়।
তবে এই ধরনের গবেষণা ও বিশ্লেষণকে ঘিরে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তথ্যের প্রবাহ ও ব্যাখ্যা প্রায়ই পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। তাই কোনো একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবুও এই প্রতিবেদনগুলো বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে, যা উপেক্ষা করা যায় না।
মানবিক দিক থেকেও এই যুদ্ধের প্রভাব গভীর। দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুদ্ধের এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত সমাধান সম্ভব না হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংকট নিরসনে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।