শাপলা প্রতীক নিয়ে বিতর্কের মাঝে এনসিপির নিবন্ধন অনিশ্চিত: প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫
  • ৬০ বার

প্রকাশ: ২১ জুলাই, ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ঘিরে আবারো শুরু হয়েছে বিতর্ক, বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-কে ঘিরে। শাপলা প্রতীক চেয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা দলটির প্রাথমিক আবেদন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হতে না পারায় শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন, উঠেছে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও অভিযোগ।

নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য এবছর ১৪৪টি দল আবেদন করেছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে। তবে কমিশনের ভাষ্যমতে, কোনো দলই প্রাথমিক শর্ত সম্পূর্ণরূপে পূরণ করতে পারেনি। ফলে ইসি এসব দলকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটতি পূরণের সুযোগ দিচ্ছে। ইসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রথম দফায় ৬২টি দলকে ও দ্বিতীয় দফায় এনসিপিসহ বাকি ৮২টি দলকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যাতে তাদের আবেদনে থাকা ঘাটতিগুলো ১৫ দিনের মধ্যে পূরণ করতে বলা হয়েছে। এরপরই হবে মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই, যার ভিত্তিতে নিবন্ধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে এনসিপির দাবি, তারা আইনানুযায়ী নিবন্ধনের যাবতীয় শর্ত পূরণ করেই ৪৩ হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্টস জমা দিয়েছে। দলের যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, “আমরা আইন অনুযায়ী সব শর্তই পূরণ করেছি। কিছু নথি একাধিকবার জমা হয়েছে, কিছু জায়গায় ভোটারদের তালিকায় এনআইডি নম্বর অনুপস্থিত থাকায় তা পুনরায় চাওয়া হয়েছে। এগুলো খুব ছোটখাটো পর্যবেক্ষণ। আমরা দ্রুতই এসব ঘাটতি পূরণ করব।”

তিনি আরও জানান, নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত থাকলেও, নির্বাচন কমিশনের কিছু সিদ্ধান্তকে তারা ‘পছন্দসই নয়’ বলেই মনে করছেন। বিশেষ করে ‘শাপলা’ প্রতীক না পাওয়াকে ঘিরে দলটি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। গত জুনে আবেদনকালে শাপলাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে এবং কলম ও মোবাইলকে বিকল্প প্রতীক হিসেবে চেয়েছিল এনসিপি। দলীয় সূত্র বলছে, প্রতীক নিয়ে কমিশনের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকও করেছে তারা।

তবে ১০ জুলাই কমিশনের বৈঠকে জানানো হয়, শাপলাকে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে রাখা হচ্ছে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম নাসিরউদ্দিন জানিয়েছেন, নাগরিক ঐক্য আগেই এই প্রতীক চেয়েছিল এবং সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে—কোনো দলকেই শাপলা প্রতীক দেয়া হবে না।

এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “শুরু থেকেই শাপলা প্রতীক নিয়ে রাজনৈতিক খেলা চলছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ইসি কোনো একটি রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শাপলাকে তালিকাভুক্ত করেনি, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক আবেদনকারী। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে হলে কেন্দ্রীয় কার্যকর কমিটি, এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় সংগঠনের উপস্থিতি, এবং অন্তত ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানার ২০০ ভোটারের সমর্থনের প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। এ ছাড়া দরখাস্তের সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্র, নির্বাচনি ইশতেহার, লোগো, দলীয় পতাকার ছবি, সদস্য তালিকা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণসহ সবকিছু থাকতে হয়। এই সমস্ত কাগজপত্র যাচাই করে ইসি নিবন্ধনের যোগ্যতা নির্ধারণ করে।

অথচ, এনসিপির দাবি—তারা এসবের কোনোটিই বাদ দেয়নি। এমনকি ঘাটতি নিয়ে যে সব পর্যবেক্ষণ এসেছে, তা গৌণ এবং দ্রুত সংশোধনযোগ্য বলে তারা জানিয়েছে। তারা মনে করছে, ইসি প্রতীক বিতরণের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে এবং এতে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো দলের প্রতীক পছন্দ, বা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন—সব দলের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

প্রেক্ষাপট বলছে, শাপলা প্রতীক নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে বিরোধ এখন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এনসিপির নিবন্ধন পাবে কি না, সেটি এখন নির্ভর করছে ইসির পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং দলটির ঘাটতি পূরণের সক্ষমতার ওপর। তবে সমালোচকরা বলছেন, শুধুমাত্র কাগজপত্রের ঘাটতির আড়ালে যদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাহলে সেটা গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক বার্তা বহন করবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত