প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ইসরাইলকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান ও ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীরা। একইসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ইরাকের বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনা এবং কূটনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। পাল্টা অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। চলমান এই সংঘাত নতুন করে বৈশ্বিক উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের তেল আবিব ও জেরুজালেমসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহরে আঘাত হেনেছে। হামলার সময় রাজধানী তেল আবিবজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বাঙ্কারে ছুটে যান। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পেতাহ তিকভা শহরে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। যদিও হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি, তবুও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপের কাছাকাছি এলাকায় শত্রুপক্ষের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। যদিও এই দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকল এবং বাহরাইনে আমাজনের ডাটা সেন্টার লক্ষ্য করে সাইবার ও অবকাঠামোগত হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা। এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক ও লজিস্টিক সেন্টার লক্ষ্য করে শক্তিশালী ড্রোন হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। হামলার পর ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইসরাইলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করেই এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একইদিন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শামায়া শহরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও সামরিক যান লক্ষ্য করে হামলার কথাও জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির এই সমন্বিত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরে নির্মাণাধীন বি-ওয়ান ব্রিজে ড্রোন হামলার ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আহত হয়েছেন অনেক বেসামরিক নাগরিক, যা মানবিক সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই হামলাকে শত্রুপক্ষের ‘নৈতিক পরাজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালী মুক্ত করার সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, শক্তি প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর পথ। তার এই মন্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে এবং অনেকেই শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দফতর। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের মূল লক্ষ্য তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় সেখানে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতিও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বনেতারা এখন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানাচ্ছেন।