প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়া সম্ভব কি না— এমন প্রশ্ন নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিকভাবে এটি সম্ভব হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল একটি পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। সাধারণত ৯০ শতাংশ মাত্রার ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এই মজুদ আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিমাণ উপাদান থেকে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও ইরান বরাবরই তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দাবি করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইসফাহান, নাতাঞ্জ এবং ফোর্দো— এই তিনটি স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে। এসব স্থাপনার বেশিরভাগ অংশ ভূগর্ভে নির্মিত, যা সম্ভাব্য সামরিক হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে কোনো সামরিক অভিযানে এসব স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এসব স্থাপনা দখলে নেওয়ার জন্য বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে হবে। স্থাপনাগুলো সমুদ্রবন্দর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে পৌঁছানোই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোই নয়, বরং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশ করা, এলাকা নিরাপদ রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। এ ধরনের অভিযানে বিপুল সংখ্যক সেনা, উন্নত প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া রয়েছে বড় ধরনের রাসায়নিক ঝুঁকি। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সাধারণত ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাস আকারে সংরক্ষণ করা হয়, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই গ্যাস পানির সংস্পর্শে এলে বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ তৈরি করতে পারে, যা পরিবেশ ও মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কোনো সামরিক হামলার সময় সংরক্ষণ সিলিন্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আশপাশের এলাকায় রাসায়নিক দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়াম ধ্বংস করাও খুব সহজ সমাধান নয়। কারণ, পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস করার সময় সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী দূষণের কারণ হতে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে ধ্বংসের পরও কিছু উপাদান অবশিষ্ট থেকে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করে।
তবে ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেছে। ১৯৯৪ সালে ‘প্রজেক্ট স্যাফায়ার’-এর মাধ্যমে কাজাখস্তান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতি এবং তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ফলে সেই অভিযানের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের মধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধানই এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা অথবা আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে তা সরিয়ে নেওয়ার মতো বিকল্প পন্থাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতিতে পারমাণবিক ইস্যু সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার প্রশ্নটি কেবল সামরিক কৌশলের বিষয় নয়, বরং এটি একটি জটিল রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং মানবিক ইস্যু। একদিকে রয়েছে যুদ্ধের সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা আশা করছেন, উত্তেজনা না বাড়িয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। কারণ, সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানানো হচ্ছে।