প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সামনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণা না করলেও, দেশের বিভিন্ন নির্বাচনি আসনে শুরু হয়ে গেছে তৎপরতা। এর মধ্যে সিলেট-২ (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) আসনটি নিয়ে দলীয় ও জনপরিসরে বিশেষভাবে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলী ছিলেন এক জনপ্রিয় মুখ। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইলিয়াসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দলীয় মনোনয়ন কার হাতে যাবে? তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনার, নাকি তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের?
বর্তমানে এই আসনের রাজনীতি বেশ জমে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা স্থানীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করছেন, অংশ নিচ্ছেন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও। শুরু হয়ে গেছে ভোটের মাঠে আগাম প্রতিশ্রুতি আর প্রচারণার সুর। ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সরব হয়ে উঠেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম তাহসিনা রুশদীর লুনা। নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দলকে সংগঠিত রাখা, নেতাকর্মীদের পাশে থাকা এবং সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি তাকে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তুলেছে। দলের নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ তার পক্ষে রয়েছে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তার একনিষ্ঠতা ও ত্যাগ তাকে স্বাভাবিকভাবেই মনোনয়নের জন্য এগিয়ে রাখছে।
তবে অন্যদিকে, কিছু নেতাকর্মী চাইছেন, হুমায়ুন কবির যেন প্রার্থী হন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী হুমায়ুন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এবং তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। যদিও তিনি এখনো নিজে মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানাননি। যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় এলাকার রাজনৈতিক মাঠে তার উপস্থিতি সীমিত। তবুও দলীয় একটি অংশ এখনও তার পক্ষে সক্রিয়।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। অধ্যাপক আব্দুল হান্নান নামে দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা এখানে সক্রিয় রয়েছেন। সভা-সমাবেশ করে তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিতিও বাড়াচ্ছেন। তার দাবি, মানুষ জামায়াতকে গ্রহণ করছে এবং নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলে তিনি জয়ী হবেন।
তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি দলের সকল দুর্দিনে কর্মীদের পাশে থেকেছেন। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে তুলেছেন, মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, এ আসনে জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং ইলিয়াস পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা তাকে দায়িত্ববান করে তুলেছে। দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি এলাকার উন্নয়নে প্রাণপাত করবেন বলে জানান।
লুনা ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেলে মাঠে নামেন গণফোরামের মোকাব্বির খান, যাকে ইলিয়াস পরিবার ও ঐক্যফ্রন্ট সমর্থন দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনিই বিজয়ী হন। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া আরও সংহত ও সুস্পষ্ট হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
এদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম লন্ডনপ্রবাসী মাওলানা এখলাছুর রহমানকে এবং খেলাফত মজলিস মুহাম্মদ মুনতাসির আলীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। মাঠে প্রচার ততটা শুরু না হলেও তারা সংগঠিত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বা গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে এখনো তেমন কোনো কার্যকর রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্রভাবে শক্তিশালী প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলেই প্রতীয়মান।
সিলেট-২ আসনের রাজনীতিতে ইলিয়াস আলী ছিলেন একটি ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে ধারণ করেই তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা আজ প্রার্থী হওয়ার পথে। তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। হুমায়ুন কবির যদি দলে কিংবা প্রবাসে উচ্চপর্যায়ের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন, তাহলে চূড়ান্ত মনোনয়নে নাটকীয় মোড়ও নিতে পারে। তবে আপাতত, মাঠের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে বলছে—তাহসিনা রুশদীর লুনাই এই আসনে বিএনপির সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন