প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতে এক যুবকের মৃত্যু এবং আরও একজন নিখোঁজ থাকার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্তজুড়ে। একদিকে নিখোঁজ যুবক সাদ্দাম হোসেনের কোনো সন্ধান না মেলায় পরিবারে চলছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নতুন করে আরেক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় সালেহ আহমদ জয়ধর (৩০) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তিনি উপজেলার দয়ারবাজারসংলগ্ন কারবালার টুক গ্রামের বিরাম আলীর ছেলে। ঘটনার পর রাতেই বিজিবি ও পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং পরবর্তীতে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ৪৮ ব্যাটালিয়নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে জয়ধরসহ তিনজন ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখা অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন নাজিরগাঁওয়ের সোহেল আহমদের ছেলে সুমন মিয়া এবং কারবালার টুক এলাকার দিলোয়ার হোসেনের ছেলে মাসুম আহমদ। তারা ভারতের চংকেটের বাগান ও মারকান বাগানের মধ্যবর্তী একটি সুপারি বাগানে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়।
বিজিবির দাবি অনুযায়ী, সেখানে অবস্থানকালে ভারতীয় খাসিয়ারা তাদের সুপারি চোর সন্দেহে গুলি ছোড়ে। এতে সালেহ আহমদ জয়ধর গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার সঙ্গে থাকা দুইজন জীবিত অবস্থায় মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ফিরে আসেন। ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
এদিকে বিজিবি-৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে নিহত ও আহতরা চোরাচালান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, সীমান্তে এ ধরনের অননুমোদিত প্রবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেই একই সীমান্ত এলাকায় আরও একটি অনিশ্চিত ঘটনার তথ্য সামনে আসে। ১ এপ্রিল কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রণীখাই ইউনিয়নের লামা উত্তমা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা কুটু মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন (৩০) নিখোঁজ হন। তার সঙ্গে থাকা সহকর্মীরা দাবি করেন, ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো মরদেহ বা নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাদ্দাম হোসেন ওইদিন বিকেলে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ভারতের উৎমা সীমান্ত এলাকার খাসিয়া পল্লীর রাজন টিলা এলাকায় গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেখানে খাসিয়াদের সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সঙ্গীরা ফিরে এলেও সাদ্দাম আর ফেরেননি। পরে তারা দাবি করেন, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
বিজিবি জানিয়েছে, সাদ্দামের বিষয়ে বিএসএফকে অবহিত করা হলেও কোনো মরদেহ বা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তিনি নিহত হয়েছেন নাকি এখনও জীবিত আছেন, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় তার পরিবার চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। গতকাল সাদ্দামের বড় ভাই নিজাম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, পরিবার এখনও তার খোঁজে অপেক্ষা করছে এবং কোনো স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
অন্যদিকে সর্বশেষ ঘটনায় নিহত জয়ধরের পরিবারের সদস্যরা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্তে পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, জয়ধরের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান ও অননুমোদিত প্রবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিদ্যমান। এর সঙ্গে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেঁষা এলাকায় নজরদারির ঘাটতি এসব ঘটনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সীমান্তে প্রাণহানি এড়াতে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে পরিবারগুলো অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পায়।
সব মিলিয়ে কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তে একের পর এক গুলিবর্ষণ, মৃত্যু এবং নিখোঁজের ঘটনায় স্থানীয় জনমনে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ নেওয়া না হলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।